এনজিওগ্রাম মানেই কি ব্লক ধরা পড়া

অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দিন

সাবেক পরিচালক ও অধ্যাপক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

বুকব্যথা বা হৃদরোগের কথা উঠলেই অনেকের মনে আসে এনজিওগ্রামের কথা। আবার কারও ধারণা, এনজিওগ্রাম করলেই হৃদযন্ত্রে ব্লক ধরা পড়বে এবং এরপর স্টেন্ট বসাতে হবে। আসলে বিষয়টি এত সরল নয়। এনজিওগ্রাম মূলত হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে রক্তপ্রবাহ কেমন আছে এবং কোথাও সংকোচন বা ব্লকেজ রয়েছে কি না, দেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এনজিওগ্রামের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী চিকিৎসার ধাপগুলো নির্ণয় করা যায়। পরে সে অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এনজিওগ্রাম একটি পরীক্ষা, এটি নিজে কোনো চিকিৎসা নয়। পরীক্ষায় ব্লক ধরা পড়লেও তার চিকিৎসা কী হবে, রোগীর সামগ্রিক অবস্থা ও ব্লকের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করেন।

কখন করবেন এনজিওগ্রাম

সব বুকব্যথার রোগীর এনজিওগ্রাম প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, বয়স, ঝুঁকির কারণ, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, স্ট্রেস টেস্ট বা অন্যান্য পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে এনজিওগ্রামের পরামর্শ দিতে পারেন। বিশেষ করে করোনারি হৃদরোগের সন্দেহ থাকলে, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে, বারবার বুকব্যথা হলে বা অন্য পরীক্ষায় হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে সমস্যা থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে এনজিওগ্রাম প্রয়োজন হতে পারে। অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি বা বাইপাসের প্রয়োজন আছে কি না, সেটি নির্ধারণেও এনজিওগ্রামের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

কেন করতে হয়

হৃদযন্ত্রের পেশিতে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছে দেয় করোনারি ধমনিগুলো। এসব রক্তনালিতে চর্বি, কোলেস্টেরলসহ বিভিন্ন পদার্থ জমে সংকোচন তৈরি হলে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে। এনজিওগ্রামের মাধ্যমে রক্তনালির কোন অংশে সমস্যা রয়েছে, কতটা সংকুচিত হয়েছে এবং একাধিক রক্তনালি আক্রান্ত কি না এসব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ফলে রোগীর জন্য পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সহজ হয়।

ব্লক ধরা পড়লে কী করবেন

এনজিওগ্রামে ব্লক ধরা পড়লেই যে স্টেন্ট বসাতে হবে, এমন নয়। ব্লকের মাত্রা, অবস্থান, রোগীর উপসর্গ, হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা এবং অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন। তুলনামূলক কম গুরুতর ক্ষেত্রে ওষুধ, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, নিয়মিত শরীরচর্চা ও অন্যান্য জীবনযাপনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হতে পারে। প্রয়োজন হলে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করে স্টেন্ট বসানো হয়। আবার কিছু জটিল বা একাধিক রক্তনালির রোগে বাইপাস সার্জারিও বিবেচনা করা হতে পারে।

এনজিওগ্রামের সুবিধা

এনজিওগ্রামের বড় সুবিধা হলো এটি করোনারি রক্তনালির অবস্থা সরাসরি দেখার সুযোগ দেয়। কোথায় এবং কতটা সংকোচন রয়েছে, শনাক্ত করে চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে সহায়তা করে। প্রয়োজনে একই ক্যাথেটারভিত্তিক চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির পরিকল্পনাও করা যায়। ফলে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।

আছে কিছু ঝুঁকিও

এনজিওগ্রাম সাধারণত নিরাপদ হলেও এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। ক্যাথেটার প্রবেশের স্থানে ব্যথা, রক্তপাত বা কালশিটে হতে পারে। ব্যবহৃত কনট্রাস্ট ডাইয়ের কারণে অ্যালার্জি বা কিডনির ওপর সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। খুবই বিরল ক্ষেত্রে রক্তনালির ক্ষতি, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা গুরুতর জটিলতাও হতে পারে। তাই প্রয়োজন ও ঝুঁকি বিবেচনা করেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে এনজিওগ্রাম করা উচিত।