বয়স্কদের গ্লুকোমা

অধ্যাপক ডা. মো. ছায়েদুল হক

ভাইস প্রিন্সিপাল, মার্কস মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল ইউনিট, মিরপুর, ঢাকা।

গ্লুকোমা চোখের এমন এক অবস্থা, যেখানে চোখের প্রেশার বা চাপ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি থাকে। ফলে চোখের স্নায়ু বা রেটিনাল নার্ভ ফাইবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অন্ধত্ব ডেকে আনে। রক্তচাপের মতোই চোখেরও চাপ আছে। যাকে বলা হয় ইন্ট্রা অকুলার প্রেশার বা আইওপি।

গ্লুকোমার কারণ

সাধারণত পারিবারিক প্রভাব ও অনেক ক্ষেত্রেই এক ধরনের জিনের ত্রুটি বা মিউটেশন গ্লুকোমার জন্য দায়ী।

গ্লুকোমার রিস্ক ফ্যাক্টর : রিস্ক ফ্যাক্টর মানে সরাসরি কারণ না হলেও কিছু কিছু বিদ্যমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। ফলে এগুলো পরিহার করে চললে রোগটির প্রাদুর্ভাব কমে যাবে। বিদ্যমান অবস্থাগুলোকে বলা হয় ওই রোগটির রিস্ক ফ্যাক্টর। গ্লুকোমার বেলায় এমন কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর শনাক্ত করা হয়েছে। যেমন চল্লিশোর্ধ্ব বয়স; পারিবারিক প্রভাব, গোত্র বর্ণ ইত্যাদি; কিছু মেডিকেল কন্ডিশন যেমন ডায়াবেটিস, মায়োপিয়া বা দূরদৃষ্টির সমস্যা; স্টেরয়েড ড্রপ ব্যবহার; জন্মনিরোধক বড়ি সেবন ইত্যাদি।

বয়স্কদের গ্লুকোমা : সাধারণত চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে পরিলক্ষিত হয়। প্রাথমিকভাবে গ্লুকোমাকে দুই ভাগে আলোচনা করা যায়। প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি। প্রাইমারি হলো চোখের অন্য কোনো অসুস্থতা ব্যতিরেকেই সমস্যাটি দেখা দিতে পারে। আর সেকেন্ডারি হলো প্রাথমিক কোনো অসুস্থতার জটিলতা হিসেবে চোখের প্রেসার বেড়ে গ্লুকোমা দেখা দেয়। এ ছাড়া গ্লুকোমাকে চোখের নিজস্ব গড়নের ওপর ভিত্তি করে দুই ভাগে আলোচনা করা যায়। একটি হলো অপেন অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা ও দ্বিতীয়টি হলো নেরো অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা।

লক্ষণ

ওপেন অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা : তেমন একটা উপসর্গ থাকে না। প্রাথমিক অবস্থায় বড়জোর একটু চোখ জ্বালাপোড়া বা পানি পড়ার মতো সমস্যা থাকে, যেটি খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না। শেষ ধাপে এসে দৃষ্টি সমস্যা দেখা দেয়। আমরা বেশিরভাগ সময় গ্লুকোমা বলতে এই উপসর্গবিহীন গ্লুকোমাকে বুঝি।

ন্যারো অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা : এতে তীব্র উপসর্গ থাকে, যেমন হঠাৎ কুয়াশার মতো বা রংধনু দেখা; চোখে প্রচন্ড ব্যথা, চোখ লাল, চোখে পানি ঝরা, দৃষ্টি কমে যাওয়া, মাথাব্যথা, অনেক সময় পেটব্যথা ও বমির ভাব বা বমিও হতে পারে। ন্যারো অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমার উপসর্গ সবসময় থাকে না। স্বাভাবিক সময়ে চোখের প্রেশার স্বাভাবিক থাকে বিধায় কোনো উপসর্গ থাকে না। বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সময় হঠাৎ চোখের প্রেশার বেড়ে যায়। চোখের প্রেশার বেড়ে যাওয়ার এই সময়টি প্রথম দিকে স্বল্পস্থায়ী হয়। এটিকে বলা হয় একিউট এটাক। বারবার অ্যাটাক হলে চোখের প্রেশার বৃদ্ধির বিষয়টি স্থায়ীরূপ লাভ করতে পারে।

প্রিসিপিটেটিং ফ্যাক্টর : প্রিসিপিটেটিং ফ্যাক্টর হলো পারিপার্শ্বিক এমন কিছু অবস্থা, যা জটিলতা সৃষ্টি করে। ন্যারো অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমার ক্ষেত্রে এমন কিছু অবস্থা যেমন অন্ধকার রুমে টিভি দেখা; উপুর হয়ে শুয়ে পড়াশোনা বা স্ক্রিনে কাজ করা; চোখে মাইড্রিয়েটিক জাতীয় ড্রপ দেওয়া; ইমোশনাল স্ট্র্রেস; টপিরামেট জাতীয় ওষুধ সেবন একিউট অ্যাটাককে ত্বরান্বিত করে। এগুলোকে একত্রে বলা হয় ন্যারো অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমার প্রিসিপিটেটিং ফ্যাক্টর।

গ্লুকোমা শনাক্তকরণ

গ্লুকোমার দুটি নিয়ামক হলো

চোখের প্রেশার ও

রেটিনার স্নায়ুর পরিমাপ।

চোখের প্রেশার : গ্লুকোমা শনাক্তে প্রাথমিক কাজ হলো চোখের প্রেশার বা আইওপি পরিমাপ করা। আইওপির স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয় ২১ মিমি অব মার্কারি। কারও কারও ক্ষেত্রে আইওপির স্বাভাবিক মাত্রা কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তাই কেবল আইওপির ওপর ভিত্তি করে গ্লুকোমা শনাক্ত করতে গেলে কিছুটা ফাঁক থেকে যায়।

রেটিনাল নার্ভ ফাইবার : রেটিনার স্নায়ু বা নার্ভ ফাইবার পরিমাপের পদ্ধতিকে বলা হয় ভিজ্যুয়েল ফিল্ড। পরিমাপের প্রত্যক্ষ বা সরাসরি পরিমাপটি হলো ওসিটি এবং অপ্রত্যক্ষ বা ইনডাইরেক্ট পদ্ধতি হলো ভিজ্যুয়েল ফিল্ড অ্যানালাইসিস। এতে কী পরিমাণ নার্ভ ফাইবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার একটি আভাস পাওয়া যায়। চোখের উচ্চচাপ ও ক্ষতিগ্রস্ত নার্ভ এই দুইয়ে মিলে বলে দেয় কারও গ্লুকোমা আছে কি নেই। ন্যারো অ্যাঙ্গেল যাদের, তাদের বেলায় কেবল অ্যাঙ্গেল ন্যারো এটুকু ধারণা থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। গ্লুকোমার উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক এটি অন্ধত্বের কারণ। তাই গ্লুকোমাকে কোনো মতেই অবহেলা নয়।