দক্ষিণ এশিয়ায় আপেল-মাল্টার দাম বাংলাদেশে বেশি

চড়া শুল্কহার, বাড়তি দামে শুল্কায়ন, অতি মুনাফার চক্র এবং বিলাসবহুল পণ্যের তালিকায় যুক্ত করার মতো বেশ কিছু পদক্ষেপে সাধারণ ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে গেছে আমদানি করা ফলের দাম। ফলে রোগীর পথ্য হিসেবে পরিচিত এসব ফল এখন ভোক্তার উপর বোঝা হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে বেশি দামে ফল বিক্রি হচ্ছে। একই ধরনের ফলগুলো ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের চেয়ে কম বিক্রি হচ্ছে।

জানা গেছে, ঢাকায় এখন এক কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকায়। যেখানে ভারতে পণ্যটির সর্বোচ্চ দাম ১৬০ টাকা, পাকিস্তানে ১৩০ টাকা, নেপালে ১৮০ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় সর্বোচ্চ দাম ৪০০ টাকা। একইভাবে আপেল প্রতি কেজি দেশের বাজারে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হলেও ভারতে প্রতি কেজির দাম মাত্র ২২০ টাকা। পাকিস্তানে ১৭০ টাকা, নেপালে ২৪০ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় সর্বোচ্চ ৪৫০ টাকা। একই চিত্র দেখা গেছে, কমলা, আঙুর ও খেজুরের দামের ক্ষেত্রে।

আমদানি করা এসব ফলের উচ্চমূল্য এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পেছনে বড় তিনটি কারণকে দায়ী করা হয়েছে ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে। এসব ফল জরুরি পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি পূরণে বছরের পর বছর সহায়ক ভূমিকা রাখলেও বছর দুয়েক আগে এটিকে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এ কারণে আমদানির ওপর আরোপ করা হয় উচ্চ কর। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত বুকিং দরের চেয়ে কাস্টমসে বেশি মূল্যে শুল্কায়ন করা। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক আমদানিকারক এসব পণ্য আমদানি করেন এবং তাদের হাতেই বাজার নির্ভরশীল। এ ছাড়া হিমাগারের সংকটের কথাও বলা হয়েছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি ও প্রবিধি বিভাগ থেকে জারি করা একটি সার্কুলারে বিলাসজাতীয় পণ্যের তালিকায় যুক্ত করা হয় এসব ফলকে। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ উৎপাদিত ফলের বাজারের সুরক্ষায় শতভাগ মার্জিন সংরক্ষণ করে আমদানির নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ফলের দাম বাড়তে থাকে লাগামহীনভাবে।

ট্যারিফ কমিশন বলছে, বর্তমানে এসব ফল আমদানিতে ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যার মধ্যে কাস্টমস ডিউটি (সিডি), সম্পূরক শুল্ক (এসডি), মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), অগ্রিম আয়কর, রেগুলেটরি ডিউটি এবং অগ্রিম কর। অর্থাৎ যত ধরনের কর রয়েছে তার প্রায় সবই দেওয়া হয়েছে ফল আমদানির ওপর। এর সঙ্গে আরও সংকট তৈরি করেছে ইচ্ছেমতো দামে শুল্কায়ন করা।

জরুরি জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় গত মাসের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলার জারি করে এসব ফলের আমদানিকারকদের শতভাগ মার্জিন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতার নির্দেশনা তুলে নেয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এসব ফলের ওপর বড় শুল্কহার রয়েছে।

এই পরিস্থিতির সমাধানে ট্যারিফ কমিশন বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে প্রথমেই বলা হয়েছে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকীকরণের বিষয়ে। কমিশন বলছে, বিলাসজাতীয় পণ্যের তালিকা থেকে বের করে তাজা ফল ও খেজুর জরুরি নিত্যপণ্যে রূপান্তর এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে শুল্কায়নের পাশাপাশি তাজা ফলকে পচনশীল বিবেচনায় ‘গ্রিন চ্যানেল’ এর মাধ্যমে খালাসের ব্যবস্থার গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের এলসি সুবিধা সহজ করে হিমাগার সুবিধার আওতা বাড়ানোর বিষয়েও সুপারিশ তুলে ধরেছেন কমিশন।

জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫ থেকে ৬ লাখ টন আমদানিকৃত তাজা ফলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে মাল্টা ও আপেলের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। পবিত্র রজমান ও ধর্মীয় উৎসব বিবেচনায় খেজুরের বার্ষিক চাহিদা রয়েছে ১ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টন। আপেল, মাল্টা, কমলা, আঙুর এবং খেজুর দেশের জলবায়ু ও বাণিজ্যিক কারণে অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে উৎপাদিত হয়। ফলে অভ্যন্তরীণ এই চাহিদার ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশই আমদানি করতে হয়। চীন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ফলের বড় অংশ আমাদনি হয়। 

অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব ফলের দাম কিভাবে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা যায় তা নিয়ে গতকাল শনিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে একটি সভা করেছে। এতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সভায় মন্ত্রী মাল্টার অস্বাভাবিক দামের কারণ অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে।

মাল্টার দাম নিয়ে মন্ত্রীর ক্ষোভ, কমতে পারে খেজুর ও মাল্টার শুল্ক

সভায় মাল্টার বর্তমান বাজারদাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনার পরও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম কীভাবে ৫২০ টাকায় পৌঁছায়, ব্যবসায়ীদের কাছে তার ব্যাখ্যা চান তিনি। অস্বাভাবিক দামে মাল্টা বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হবে না।’

একইসঙ্গে বাজারে মাল্টা, খেজুরসহ আমদানিনির্ভর ফলের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানিকারকদের দ্রুত ঋণপত্র (এলসি) খুলে আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদির।

সভা সূত্রে জানা গেছে, খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে সুপারিশ করবে। ব্যবসায়ীদের শুল্ক-কর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চলতি সপ্তাহেই জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী। একইসঙ্গে ব্যবসায়ীদের মাল্টা আমাদনির উপর থাকা শুল্ক কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। 

সভায় ব্যবসায়ীরা জানান, মাল্টার বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ সরবরাহের ঘাটতি। তাঁদের হিসাবে, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টার প্রয়োজন হয়। উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলেও জানান আমদানিকারকেরা। পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিও রয়েছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।

খেজুর আমদানির প্রস্তুতি নিতে বললেন মন্ত্রী

আসন্ন চাহিদা বিবেচনায় ব্যবসায়ীদের এখন থেকেই খেজুর আমদানির প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, খেজুরের শুল্কের বিষয়ে চলতি সপ্তাহেই সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হবে। খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য নির্ধারণের দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করবে।

বৈঠকে দেশে আমদানি হওয়া বিভিন্ন মান ও গ্রেডের খেজুরের আন্তর্জাতিক উৎসমূল্য যাচাই করে একটি যৌক্তিক নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে পাঠানো হবে।

সভায় এনবিআরের প্রতিনিধি জানান, বর্তমানে বিভিন্ন মান ও গ্রেডের খেজুরের প্রকৃত ক্রয়মূল্য আলাদা হলেও শুল্কায়নের ক্ষেত্রে সেই পার্থক্য সব সময় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। এ কারণে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারদর ও উৎসমূল্য বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।

সভায় ব্যবসায়ীরা বিকল্প উৎস থেকে মাল্টাসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলের আমদানি বাড়ানোর আশ্বাস দেন। সরকারের পক্ষ থেকেও শুল্ক-কর, শুল্কায়ন ও আমদানি প্রক্রিয়ায় যৌক্তিক সমস্যাগুলো পর্যালোচনার কথা জানানো হয়।

সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।