জলে যাচ্ছে বিসিবির টাকা

মাত্র ১৫ মিনিটের বৃষ্টিতেই অসহায় হয়ে পড়েন ঢাকা তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগ বাছাই পর্বের দল ১০-১২ স্পোর্টিং ক্লাবের খেলোয়াড়রা। গত শুক্রবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে মর্তুজা ফাউন্ডেশনের বিপক্ষে ম্যাচ ছিল তাদের। বৃষ্টি নামার আগে বেশ ভালো অবস্থানেই ছিল দলটি। ১৪ ওভার ১ বলে ২ উইকেট হারিয়ে ১৩৪ রান তোলে তারা। অস্থায়ী ড্রেসিংরুমের সামনে তখন খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস। সেটা একটু পরই হতাশায় রূপ নেয়। স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতে মাঠে পানি জমে যায়। পরিত্যক্ত হয় ম্যাচটি। এমনকি তাঁবু টাঙিয়ে তৈরি করা অস্থায়ী ড্রেসিংরুমেও পানি পড়ে। ভিজে যায় ক্রিকেটারদের ব্যাট, প্যাড, কিটস ব্যাগসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা পাননি খেলোয়াড়রাও।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ক্লাবটির কর্ণধার আবির হাসান মিলন, ‘মাত্র ১০-১৫ মিনিটের বৃষ্টিতেই মাঠে পানি জমে গেছে। পিকেএসপি, ক্রিকেটার্স একাডেমি বা অন্য মাঠে হলেও খেলা হতো। এমন মাঠে অনূর্ধ্ব-১২ বা অনূর্ধ্ব-১৪ দলের ম্যাচ আয়োজন করা উচিত নয়। কোনো ড্রেসিংরুমও নেই। অস্থায়ী একটা তাঁবু করে দিয়েছে। সেখানেও পানি পড়ে। ছেলেরা যে দাঁড়াবে, দাঁড়ানোরও কোনো জায়গা নেই। ব্যাট, কিটস ব্যাগসহ সবকিছু ভিজে গেছে।’

বৃষ্টিতে যখন দুই দলের খেলোয়াড়রা নিজেদের ব্যাট-প্যাড ও সরঞ্জাম রক্ষার চেষ্টায় ব্যস্ত, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে একই মাঠে ফুটবল নিয়ে খেলতে দেখা যায়। অথচ তখনো ম্যাচ শেষ হওয়ার ঘোষণা আসেনি।

শুক্রবার সকালের ম্যাচটির পর দুপুরে একই মাঠে আরও একটি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠে পানি জমে থাকায় সেটিও মাঠে গড়ায়নি। টস না করেই ফিরে যেতে হয় দুই দলের ক্রিকেটারদের। পরের দিন, অর্থাৎ গতকালও মাঠ ভেজা থাকায় দিনের প্রথম ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়। দ্বিতীয় ম্যাচটি মাঠে গড়ালেও ওভার কমানোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের বাউন্ডারির দৈর্ঘ্যও কমিয়ে আনতে বাধ্য হন ম্যাচ অফিশিয়ালরা।

গতকাল পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টে মোট ৫১টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে পরিত্যক্ত হয়েছে তিনটি, যার সবগুলোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে। অথচ বিসিবির একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, এই মাঠ ব্যবহারের জন্য বোর্ডকে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী বাড়তি অর্থ খরচ করার কথা নয় ক্রিকেট বোর্ডের।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে মাঠ উন্নয়নের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে (ডাকসু) ২ কোটি টাকা দেয় বিসিবি। বিনিময়ে ক্রিকেট মৌসুমে বছরে ১০০ দিন মাঠ ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ার কথা, যেখানে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটসহ ঘরোয়া ক্রিকেটের নানা ম্যাচ ও অনুশীলন আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল বোর্ডের। অথচ সেই মাঠের জন্যই প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে ভাড়া। চুক্তি অনুযায়ী মাঠ ব্যবহারের সুযোগ থাকার পরও কেন এই ভাড়া দিতে হচ্ছে বিসিবিকে?

এটা জানতে বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান শানিয়ান তানিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি, ‘কে বলেছে এটা? দুই কোটির সঙ্গে কি এরকম কোনো চুক্তি হয়েছিল? এটা অনুদান ছিল না? হতে পারে। তাহলে আমার একটু যাচাই করতে হবে। মিলিয়ে দেখে আমি জানাতে পারব।’ এরপর আর ফোন ধরেননি শানিয়ান।

তবে চুক্তির বিষয়টি স্বীকার করেন আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সময় বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্বে থাকা আদনান রহমান দীপন বলেন, ‘আমি শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারি যে এমন চুক্তি হয়েছে। আমরা লিগসহ বিভিন্ন টুর্নামেন্ট এবং আমাদের প্রয়োজনে যেন এই মাঠটা ব্যবহার করতে পারি, তেমন একটি সমঝোতা হয়। এ জন্য ওই ২ কোটি টাকার বাইরে জিমনেশিয়ামসহ আরও বেশ কিছু জায়গায় উন্নয়নমূলক কাজ করে দেয় বিসিবি।’

বিসিবির আর্থিক সহায়তার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে উন্নয়নের দৃশ্যমান ছাপ নেই। সামান্য বৃষ্টিতেই মাঠে পানি জমছে। ক্রিকেটারদের জন্য নেই স্থায়ী ড্রেসিংরুম। অস্থায়ী তাঁবুতেও পানি ঢুকে পড়ছে। এর সঙ্গে মাঠ ব্যবহারের জন্য বিসিবিকে নিয়মিত ভাড়া দিতে হচ্ছে। মাঠ পরিচর্যার জন্যও আলাদাভাবে সহায়তা করছে বোর্ড। ফলে প্রশ্ন উঠছে, মাঠ উন্নয়নের জন্য দেওয়া ২ কোটি টাকা কীভাবে ব্যয় হয়েছে এবং চুক্তি অনুযায়ী মাঠ ব্যবহারের সুযোগ থাকার পরও কেন বিসিবিকে নিয়মিত ভাড়া দিতে হচ্ছে?

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন বলেন, ‘আমাদের খেলা না থাকলে মাঠ ভাড়া দেয়। অন্য কোথাও যেন ভাড়া দিতে না হয়, এজন্য আমরা অনুদান হিসেবে টাকাগুলো নিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এত টাকা নেই যে মাঠ উন্নয়নের জন্য ব্যয় করবে। কিন্তু টাকাগুলো আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। সেভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের কাছে পড়ে আছে। আমরা বলেছি, টাকা কাজে না লাগালে বিসিবিকে যেন ফিরিয়ে দেওয়া হয়।’