প্রথমবারের মতো ধ্বংস হচ্ছে অ্যাসিড

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা সময়ের শিল্পের কাঁচামাল অসময়ে হয়ে যায় বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্য। ২০০৩ সালে শিল্পের প্রসারের জন্য যে রাসায়নিক পণ্যটি আনা হয়েছিল দীর্ঘদিন তা বন্দরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় এখন তা রূপ নিয়েছে ক্ষতিকারক রাসায়নিক পণ্যে। এমন পণ্য কিন্তু একটি নয়, বন্দরে ৩২৩টি কনটেইনারে রয়েছে এমন রাসায়নিক পণ্য। এগুলোর মধ্যে গতকাল শনিবার ৯ কনটেইনার পণ্য ধ্বংসের জন্য পাঠানো হয়েছে নারায়ণগঞ্জের ওয়াটা কেমিক্যালস কারখানায়। সেখানেই ধ্বংস হবে সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড, থিনার ও মিথানল নামের রাসায়নিক উপাদান।

ইতিপূর্বে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সাধারণত ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় রাসায়নিক পদার্থগুলো ধ্বংসের জন্য নেওয়া হতো সিলেটের ছাতকে লাফার্জ সিমেন্ট কারখানায়। কিন্তু রাসায়নিক উপাদানগুলোর যেগুলোতে অ্যাসিড রয়েছে সেগুলো কোথাও ধ্বংসের সুযোগ ছিল না। ফলে বন্দরের ভেতরে দিন দিন বাড়ছিল এসব রাসায়নিক পণ্য। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সেপ্টেম্বর মাসের পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বন্দরের ভেতরে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য ৩২৩টি কনটেইনারে রয়েছে। এগুলো যত দ্রুত বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া যাওয়া যাবে বন্দরের ইয়ার্ড তত দ্রুত ঝুঁকিমুক্ত হবে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় এসব কনটেইনারের মধ্যে ৪৪টি কনটেইনার ভেঙে যাওয়ায় সেগুলোর ভেতরে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঝুঁকিও বেড়েছে।

কিন্তু এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক পণ্য কোথায় নিয়ে ধ্বংস করা হবে, তা নিয়ে বিপাকে পড়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে কাস্টমসের নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ বলেন, রাসায়নিক পণ্যগুলো কোথায় ধ্বংস করা হবে, তা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় কর্তৃপক্ষ নামের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি কাজ করছিল। এই কর্তৃপক্ষের রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনের (বিএনএসিডব্লিউসি) সুপারিশক্রমে এবং কাস্টমস হাউজ চট্টগ্রামের ধ্বংস কমিটির উদ্যোগে বিপজ্জনক রাসায়নিক নারায়ণগঞ্জের ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও নিয়মানুগ পদ্ধতিতে ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর এরই আলোকে প্রথমবারের মতো গতকাল শনিবার ৯ কনটেইনার রাসায়নিক পণ্য ধ্বংসের জন্য পাঠানো হয়।

কোন কোন রাসায়নিক পণ্য রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৯টি কনটেইনারে ১৫০ দশমিক ৮৯ টন অ্যাসিড ও অ্যাসিড জাতীয় রাসায়নিক পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ কনটেইনার মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার রয়েছে।

এত বছর এসব পণ্য ধ্বংস করা যায়নি কেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমদানিকারক এসব পণ্য খালাস করে না নেওয়ায় এবং অনেক দফায় চিঠি দেওয়ার পরও অনেকে নেয়নি। আবার মামলা বা ডকুমেন্টস সংক্রান্ত জটিলতায়ও অনেক পণ্য খালাস হয়নি। আর দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় পণ্যগুলো ব্যবহার উপযোগিতা নেই বলে নিলামেও বিক্রি করা যাচ্ছে না। তাই ধ্বংস করা ছাড়া উপায় নেই। আবার ধ্বংস করতে গিয়ে কোথায় করা হবে তা নিয়েও বিপত্তি ছিল।

এদিকে অ্যাসিড-জাতীয় রাসায়নিক উপাদানগুলো খুবই ক্ষতিকর হওয়ায় এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক পণ্য ধ্বংসের মাধ্যম ঠিক রয়েছে কি না সে বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক রসায়নবিদ জমির উদ্দিন বলেন, সরকারের একটি জাতীয় কমিটি নারায়ণগঞ্জের সংশ্লিষ্ট কারখানাটি পরিদর্শন করেছে। তাদের পরিদর্শনে সেই কারখানায় এসব রাসায়নিক উপাদান ধ্বংস করা যাবে মর্মে রিপোর্ট দিয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশসম্মত উপায়েই এই অ্যাসিডগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট করা হবে।

ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেড কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ১০০ একর জায়গার ওপর ১৯৮৪ সালে এই কেমিক্যাল কারখানাটি গড়ে তোলা হয়েছে। আমরা অ্যাসিড-জাতীয় রাসায়নিক উপাদানগুলো এখানে উৎপাদন করি এবং দেশের বিভিন্ন শিল্প কারখানায় সরবরাহ করি। কিন্তু কারাখানায় অ্যাসিড কীভাবে ধ্বংস করা হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা প্রতি রাতে ২০০ টন সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন করি। আবার ধ্বংস করার জন্যও আমাদের প্ল্যান্ট রয়েছে। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে অ্যাসিড জাতীয় যেসব রাসায়নিক পণ্য রয়েছে সেগুলো ধ্বংসের জন্য আমাদের বলা হয়েছে। আমরা বিনা মাশুলে এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক পণ্য ধ্বংস করে দেব। বিনিময়ে হয়তো সরকার আমাদের একটি সনদপত্র দেবে। গতকাল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এগুলো আমাদের কারখানার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে বলে জেনেছি।

বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও সংস্থাটির সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরে থাকা ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্র্ণ রাসায়নিক পণ্য সরিয়ে নিতে আমরা প্রতি মাসেই কাস্টমসকে চিঠি দিয়ে থাকি। গত মাসের চিঠিতেও এসব পণ্য সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তবে এসব পণ্য যত দ্রুত বন্দরের ভেতর থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে বন্দর তত দ্রুত ঝুঁকিমুক্ত হবে। নিরাপদ বন্দরের স্বার্থেই এগুলো সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, বিশ্বের অনেক বন্দরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালের ৪ আগস্ট লেবাননের বৈরুত বন্দরে রাসায়নিক বিস্ফোরণে ১০০ জনের মৃত্যু ও সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিল। এ ছাড়া গত শনিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান প্রদেশের শহিদ রাজায়ি বন্দরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম বন্দরেও ২০২০ সালে দুই নম্বর জেটির কাছে তিন নম্বর শেডে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছিল। এ ছাড়া ২০২২ সালের ১২ মে চার নম্বর গেটের কাছে একটি কনটেইনারে আগুন লেগেছিল। তাই নিরাপদ বন্দরের স্বার্থে ক্ষতিকর রাসায়নিক পণ্য সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। গতকাল ৯ কনটেইনার রাসায়নিক পণ্য বন্দরের ৪ নম্বর গেট দিয়ে পুলিশ এসকর্টের মাধ্যমে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।