ভাঙন-অব্যবস্থাপনায় পারকি সমুদ্রসৈকত

জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সমুদ্রের তীব্র ঢেউয়ের কারণে পারকি সমুদ্রসৈকত আজ তীব্র ভাঙনের মুখে। গত দেড় দশকে প্রায় এক কিলোমিটার ঝাউবন সাগরে বিলীন হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকান্ড, দূষণ, দখল এবং চরম প্রশাসনিক গাফিলতি। ফলে সংকুচিত বেলাভূমি জোয়ারের সময় পুরোপুরি পানির নিচে চলে যায়।

এদিকে সৈকত রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা জিও টিউব ও জিও ব্যাগগুলো এখন পর্যটকদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এগুলোর কারণে সৈকতে বিপজ্জনক ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন দর্শনার্থী ও স্থানীয়রা। যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের অন্যতম এই পর্যটন কেন্দ্রটি আজ তার রূপ হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে।

জোয়ার নেমে গেলে পুরো সৈকতে ফুট ওঠে এক বিধ্বস্ত চেহারা। বিভিন্ন গর্তে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে থাকে। উঁচু-নিচু খাদের কারণে মানুষকে স্বাভাবিক চলাফেরায়ও বেগ পেতে হয়। বিভিন্ন ভাঙা স্থাপনার কংক্রিট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে। এগুলোতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। জিও ব্যাগের স্তরে কিংবা ভাঙা স্থাপনায় আটকে আছে প্লাস্টিক ও বিভিন্ন বর্জ্য। পর্যটকরা অনেকেই জোয়ারের সময় প্রথমবার সৈকতে এসে কোনো ধারণা ছাড়াই গোসলে নেমে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। তাদের সতর্ক করার জন্য সৈকতে নেই কোনো সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড কিংবা জরুরি চিহ্ন।

জানা গেছে, ২০২০ সালের আম্ফান, ২০২১ সালের ইয়াস, ২০২২ সালের সিত্রাং, ২০২৩ সালের মোখা ও ২০২৪ সালের রেমাল ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গত কয়েক বছরে আনোয়ারা উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে বেড়িবাঁধ, বসতবাড়ি, কৃষিজমি, মৎস্য ঘের, সড়ক-বাজার ও পারকি সমুদ্রসৈকত এলাকায় ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হয়। ফলে নষ্ট হচ্ছে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঝুঁকির মুখে পড়ছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আনোয়ার বলেন, ‘সৈকতের বিভিন্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা, গাছপালা ধ্বংস ও পরিবেশের প্রতি উদাসীনতার কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এসব কারণে ধীরে ধীরে পারকির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।’

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো.আবু জাফর মজুমদার বলেন, ‘সৈকত রক্ষায় জিও টিউব ও ব্যাগ ব্যবহার নদী রক্ষার ডিজাইনে করা হচ্ছে। এগুলো সমুদ্র রক্ষার ডিজাইনে করা দরকার। সৈকত রক্ষায় অস্থায়ীভাবে এ পরিকল্পনায় কিছুটা বালিক্ষয় রোধ হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ‘পারকি সি-বিচ সংরক্ষণ’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এটি অনুমোদন পেলে সৈকত রক্ষা করা সম্ভব হবে।’

পারকি সমুদ্রসৈকতের ক্রমবর্ধমান ভাঙনরোধে জিও ব্যাগের ব্যবহার সাময়িক উপশম দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো.শফিউল আলম বলেন, ‘বছর খানিক পরপর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ রিফিল করা হলেও তা ফেটে গিয়ে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এর স্থায়ী ও সাশ্রয়ী বিকল্প খোঁজা জরুরি। সমুদ্রতীরের ভাঙনরোধে পরিবেশবান্ধব ম্যানগ্রোভ বনায়ন একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে। তবে এটি পর্যটনস্থল হওয়ায় পর্যটকদের বিচরণের স্বার্থে সৈকতজুড়ে এ ধরনের বনায়ন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে একটি বিকল্প হতে পারে ভারতের তামিলনাড়ু বা কর্ণাটকের মতো আধুনিক গ্রোয়েন” বাঁধ।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভিন বলেন, ‘পারকির পর্যটন সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ জোর দিতে হবে। পরিকল্পিত উপকূলীয় সুরক্ষা নীতি গ্রহণ না করলে অচিরেই পারকির বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া পারকির সমুদ্রঘেঁষা বেড়িবাঁধের কিছু পয়েন্ট এখন দৃশ্যমান ঝুঁকির মুখে রয়েছে।’

জানা যায়, স্থায়ীভাবে পারকি সমুদ্রসৈকত রক্ষায় ৫৪৮ কোটির বেশি টাকার ‘পারকি সি-বিচ সংরক্ষণ’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ ও তীর রক্ষা কাজ করা হবে। এতে সুরক্ষা পাবে পারকি সৈকত, কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়ক, স্থানীয় বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বর্তমানে প্রকল্পটির ডিজাইন প্রস্তুতের কাজ চলছে।

পারকি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. কাশেম বলেন, ভাঙনের কারণে পর্যটক কমে যাচ্ছে, ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পারকি তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পাবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা যেমন সুরক্ষিত হবে, তেমনি ফিরে আসবে দেশের অন্যতম সমুদ্রসৈকত পারকির সৌন্দর্যও। ঝুঁকি মোকাবিলা এবং স্থানীয় কৃষি ও পর্যটন খাতকে চাঙা করতে প্রকল্পটি অতীব জরুরি। এতে সুরক্ষা পাবে কর্ণফুলী টানেলের সংযোগ সড়ক, নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়া এবং পারকি সমুদ্রসৈকতের পর্যটন এলাকা।

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, পারকি বিচ উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমানে অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে যাচাই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এখন ডিজাইন প্রস্তুতের কাজ চলছে। তিনি আরও বলেন, উত্তর পরুয়াপাড়া থেকে পারকি বিচ পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা সুরক্ষার আওতায় আনা হবে। অনুমোদন পেলে ২০২৭ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।