‘অধিকার বেশি কার বনের উপর
সেই তর্কে বেলা হল, বাজিল দুপুর।
বকুল কহিল, শুন বান্ধব-সকল,
গন্ধে আমি সর্ব বন করেছি দখল।
পলাশ কহিল শুনি মস্তক নাড়িয়া,
বর্ণে আমি দিগ্বিদিক রেখেছি কাড়িয়া।
গোলাপ রাঙিয়া উঠি করিল জবাব,
গন্ধে ও শোভায় বনে আমারি প্রভাব।
কচু কহে, গন্ধ শোভা নিয়ে খাও ধুয়ে,
হেথা আমি অধিকার গাড়িয়াছি ভূঁয়ে।
মাটির ভেতরে তার দখল প্রচুর,
প্রত্যক্ষ প্রমাণে জিত হইল কচুর।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (অধিকার : কণিকা কাব্য)
মধ্যযুগের মঙ্গল সাহিত্য থেকে শুরু করে বিশ শতকের রবীন্দ্রনাথ-বিভূতিভূষণ পর্যন্ত সাহিত্যিকরা বাংলার অবহেলিত বন্যপল্লি প্রকৃতির রূপ বর্ণনায় নানাভাবে কচুকে টেনে এনেছেন। কখনো ওলকচু, কখনো মানকচু আবার কখনো দুধকচু। মুকুন্দরামের চন্ডিমঙ্গল কাব্যে ভাদ্র মাসে ওলকচু পোড়া খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘অধিকার’ কবিতায় যেভাবে বুনো কচুকে রূপকার্থে মর্যাদাবান করেছেন তাতে কচুকে আর অবহেলার চোখে দেখার উপায় নেই। বনে কত ফুল ফোটে কিন্তু সে বনে কার অধিকার বেশি এ নিয়ে যখন সেসব ফুলগাছদের মধ্যে তর্ক বাঁধে তখন বকুল, পলাশ ও গোলাপ প্রত্যেকেই নিজেদের সৌন্দর্য ও সুবাসের বড়াই করে এবং বন নিজেদের দখলে বলে দাবি করে। কচুর আর ফুল কি? কচু ওদের মতো বাহ্যিক সৌন্দর্য বা সুবাসের বড়াই করে না। সে তার মাটির নিচে শিকড়ের দখল নিয়ে প্রমাণ করে যে আত্মিক বা বাস্তব উপস্থিতি বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
এ বছর আটাশে ভাদ্রে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে প্রকৃতিসখাদের সঙ্গে জিন্দা পার্কে গিয়ে জলাশয়ের পাড়ে দুধকচুর ফোটা ফুলগুলোকে দেখে অধিকার কবিতার এ কথাগুলোই বেশি মনে পড়ছিল। খটকা লাগে যখন কচুর অনেকগুলো নাম শুনি। সবই কচু, তাহলে দুধকচুটা আবার কি? জিন্দা পার্কের সে গাছগুলোর ফুল (পুষ্পমঞ্জরি) দেখে একবার মনে হয়েছিল, ফুলের রঙ তো দুধের মতো সাদা না, ক্ষীরের মতো রঙ। তাহলে দুধ শব্দটা কেন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। জানা গেল, এর ডাটি কাটলে সাদা দুধের মতো কষ ঝরে বলেই এর নাম হয়েছে দুধকচু বা দুধমান কচু (Xanthosoma sagittifolium)। এর গোড়ায় মাটির নিচে মুখীর মতো হয় বলে কেউ কেউ একে মুখীকচু বা দুধমুখীকচুও বলে। এলাকাভেদে এর আরও কিছু স্থানীয় নাম আছে। ছোটবেলায় এসব কচুর ডাটি কেটে চিংড়ি মাছ দিয়ে রান্না করা হতো। খুব সুস্বাদু ছিল সে খাদ্য। তখন মা বলতেন, ওগুলো দস্তাকচুর ডাইগো (ডগা)। পাবনা গিয়ে শুনলাম সে কচুরই নাম মৌলভী কচু। টাঙ্গাইলে গিয়ে পেলাম তার নাম দুধকচু। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার খাকজানা গ্রামে বিলের পাড়ে ঢালে জন্মানো সে গাছটার মতো এত বড় দুধকচু গাছ আর কখনো দেখিনি, টাঙ্গাইলে দেখা সে গাছটি ছিল আমার চেয়ে প্রায় দেড়গুণ লম্বা। একটা পাতার উপর দুজন দিব্যি বসে থাকা যায়, বর্ষার সময় ডাটিসহ কেটে ছাতার মতো মাথায় দিয়ে হাঁটা যায়। এরূপ বিশাল আকারের তীরের ফলাকৃতি পাতার কারণে এর ইংরেজি নাম হয়েছে অ্যারোলিফ এলিফ্যান্ট ইয়ার।
দুধকচু পাতার ফলক ৬০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার লম্বা ও অনেকটা তীরের ফলার মতো আকৃতির ও এর অগ্রভাগ তীক্ষè। পাতার প্রতি কক্ষ বা বোঁটার কোল থেকে চার থেকে ছয়টি পুষ্পমঞ্জরি বের হয়। পাতা, ডাটি সবকিছুর রঙ হালকা দুধেল সাদাটে-সবুজ। পাতার উপরে হালকা সাদাটে মোমের মতো আবরণ থাকে, নিচের পিঠ সবুজ। আবার বাগেরহাটের ফকিরহাট ও সাতক্ষীরায় তালার দুটি গ্রামে গিয়ে সেই একই রকম পাতা, ডাটি ও চেহারার কয়েকটা গাছ দেখেছিলাম। পার্থক্য হলো সেসব গাছের পাতার শিরা ও ডাটির রঙ ঘন কালচে বেগুনি। গ্রামবাসীরা বলেছিলেন, সে কচুর নাম সুরমাকচু। জানিনা সে কারণেই এর ইংরেজি নাম পার্পলস্টেম ট্যারো ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক প্রতিনাম রাখা হয়েছিল কি না Xanthosoma violaceum. সেটিরও ডাটা কাটলে দুধের মতো কষ ঝরে। এজন্য এটিও দুধকচুর একটি জাত।
অ্যারেসী পরিবারের অন্য উদ্ভিদের মতোই দুধকচুরও ফুল ফোটে মোচার মতো একটা খোলস বা আবণের মধ্যে দ-াকার পুষ্পমঞ্জরিতে যাকে উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় বলে স্পাইক। খোলসটি ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, নিচের অংশটি সবুজ ও নলাকার, ওপরের অংশটি ঘিয়া-সাদা বা ক্ষীরবর্ণ। ফুলগুলোর কোনো পাপড়ি নেই, ক্ষুদ্র, একলিঙ্গী। স্পাইক বা ডাটির ওপরের দিকে ফোটে পুরুষ ফুল, নিচের দিকে থাকে স্ত্রী ফুল। পরাগায়ন ঘটে পোকামাকড় দ্বারা। পরাগায়নের জন্য পুষ্পমঞ্জরি থেকে এক ধরনের তীব্র গন্ধ বের হয় যা পোকাদের আকৃষ্ট করে। পরাগায়ন ও নিষেকের পর ফল হয়। ফল ছোট, হলুদ ও গোলাকার। ফুল ফোটে ও ফল ধরে মে থেকে অক্টোবরে। মাটির নিচে থাকা কন্দ থেকে চারা জন্মে। আমেরিকায় জন্মভূমি হলেও এটি এখন আমাদের বন্য ও আবাদকৃত একটি গ্রামীণ উদ্ভিদ।
লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ