রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় নগর রাজনীতিতে সিটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। নির্বাচন সামনে রেখে এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা। ইতিমধ্যে জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে নেমেছে। একই সঙ্গে ১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এনসিপিও নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছে। তবে ভিন্ন চিত্র বিএনপিতে। দলটি তাদের প্রাথী ঘোষণা না করায় নির্বাচনী প্রচারে সেভাবে মাঠে নেই কেউ। তবে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় সমর্থনের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে প্রশাসকের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন পরিচালিত হওয়ায় নগরীর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। রাজশাহী সিটির সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের জুনে। এতে বিএনপি ও জামায়াত অংশ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগের এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন মেয়র নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
১৯৮৭ সালে রাজশাহী পৌরসভা সিটি করপোরেশনে রূপান্তরিত হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের মধ্যে আলোচিত বিএনপির মিজানুর রহমান মিনু। তিনি দীর্ঘ সময় মেয়র পদে ছিলেন। তার সময়কাল নগর উন্নয়নের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে আলোচিত। আগামীতে বিএনপি যাকেই মনোনয়ন দিক, মিনুর আমলের উন্নয়নের প্রসঙ্গ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো একক প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। দলীয় মনোনয়ন পেতে বেশ কয়েকজন নেতা কেন্দ্রে তদবির করছেন। এদিকে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে বর্তমান রাসিক প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটনের নাম আলোচনায় রয়েছে। প্রশাসক নিয়োগের সময়ও বিএনপির একাধিক নেতার নাম আলোচনায় এসেছিল। শেষ পর্যন্ত গত মার্চে রিটনকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব পেয়ে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিচ্ছন্নতা ও নগরীর বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে কাজ করছেন রিটন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়িয়েছেন তিনি। দলীয় মনোনয়ন পেলে এবং নির্বাচিত হলে নগরবাসীর সেবার মান আরও বাড়াতে কাজ করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ সম্পাদক এবং সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। গত জুলাইয়ে বন উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি রাজশাহী ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তার অনুসারীরা মনে করছেন, দলীয় মনোনয়ন পেলে তিনি আবারও মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুনও মেয়র পদে প্রার্থী হতে আগ্রহী। দলীয় ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় রয়েছেন তিনি। মনোনয়ন পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে মামুন বলেন, দল তার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ড মূল্যায়ন করবে। এ ছাড়া রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট, যুবদল নেতা রফিকুল ইসলাম রবি, রাজশাহী কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি সাহিদ হাসান ও বিএনপির রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন শওকতের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। তবে বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর মধ্যে শেষ পর্যন্ত কে দলীয় সমর্থন পাবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। মনোনয়নবঞ্চিতরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কীভাবে মাঠে থাকবেন, সেটিও নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে রাসিকের মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে বিএনপির মিজানুর রহমান মিনুর কাছে পরাজিত হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পান জাহাঙ্গীর। রাজশাহীতে জামায়াতের প্রার্থীর এত ভোট পাওয়া দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
তবে জামায়াতকে ছাড় দিতে নারাজ তাদের ১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এনসিপি। দলটি এরই মধ্যে রাজশাহী মহানগরের আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলীকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় নেতারাও রাজশাহীতে এসে তার পক্ষে প্রচারে অংশ নিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তের ওপর এনসিপির নির্বাচনী অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করবে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন। জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন না করলে দলটি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এনসিপির প্রার্থী মোবাশ্বের আলী বলেন, তিনি দলের প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করছেন।
রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি এমাজ উদ্দিন মন্ডল বলেন, এনসিপি তাদের মতো করে প্রচার চালাচ্ছে। আমরা আমাদের প্রার্থীর জন্য কাজ করছি। বাকিটা নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তের ওপর। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় রাজশাহীর রাজনীতিতে সিটি নির্বাচনের হাওয়া বইছে। শেষ পর্যন্ত কোন দল কী কৌশল নেয়, কারা প্রার্থী হন এবং জোটগুলোর অবস্থান কী হয় এসবের ওপরই নির্বাচনের চূড়ান্ত চিত্র অনেকটা নির্ভর করবে।