বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও দেশটির ৯২ শতাংশ পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পাবে। এই সুবিধার আওতায় তৈরি পোশাকও থাকবে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আরও তিন বছর বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক।
রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সারাহ কুক বলেন, যুক্তরাজ্যের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার। দুই দেশের সম্পর্ক এখন আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ার বিষয়টিও এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও সম্পর্ককে তিনি দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার। তিনি জানান, বাংলাদেশে যুক্তরাজ্য অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী। আর্থিক খাত, পোশাক ও ফ্যাশন, শিক্ষা এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রসঙ্গে সারাহ কুক বলেন, এই পরিবর্তন যেন মসৃণ এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয়, সেটিই এখন দুই দেশের সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম’কে তুলনামূলকভাবে সহজ ও উদার বাণিজ্য সুবিধার একটি ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে জানান ব্রিটিশ হাইকমিশনার। তাঁর মতে, পারস্পরিক আস্থা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে এই অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে। একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের স্বার্থ এক জায়গায়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের দায়িত্ব ও ভূমিকাকেও যুক্তরাজ্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বলে জানান তিনি।
বর্তমান সময়ের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় প্রচলিত নিরাপত্তা ধারণার বাইরে গিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন সারাহ কুক। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেন, এ সংকট যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থেকে আড়ালে না যায়, সে বিষয়ে যুক্তরাজ্য কাজ করে যাবে। একই সঙ্গে সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের জন্যও দেশটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরিস্থিতি অনুকূল হলে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়াকেই সংকট সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাজ্য।
জলবায়ু পরিবর্তনকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের অভিন্ন স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন সারাহ কুক। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকায় যে প্রভাব পড়ছে, তা অত্যন্ত বাস্তব। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং ঘন ঘন চরম আবহাওয়ার ঘটনা ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এসব পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বহন করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।