আত্মার পরিশুদ্ধিতে সফলতা

আত্মশুদ্ধি দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার নিশ্চয়তা দেয়। আল্লাহতায়ালা কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘সেই সফলকাম যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং সেই ব্যর্থ যে তার আত্মাকে কলুষিত করেছে। (সুরা শামস ৯-১০) অর্থাৎ অন্তরের শুদ্ধিই হলো প্রকৃত সফলতার মাপকাঠি। একজন মানুষ যত বড় ধন-সম্পদের মালিক হোক, যত উচ্চপদে অধিষ্ঠিত থাকুক বা যত বড় প্রতিভার অধিকারী হোক, যদি তার অন্তরে শুদ্ধতা না থাকে তবে সে প্রকৃত সফলতার স্বাদ পায় না। আর অন্তর যখন পবিত্র হয়, তখনই মানুষ সত্যিকার অর্থে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে।

পরিশুদ্ধ জীবনের জন্য ইসলাম বেশ কয়েকটি আমলকে গুরুত্ব দিয়েছে, তা শুধু ইবাদতের পরিপূর্ণতা আনে না, বরং মানুষের অন্তরে শান্তি ও জীবনে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। এগুলো অনুশীলন করলে একজন মুমিন আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার দ্বার উন্মুক্ত হয়। এমনই কয়েকটি আমল উল্লেখ করা হলো।

দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করা : দুনিয়ার মোহ মানুষকে আধ্যাত্মিক উন্নতি থেকে বিরত রাখে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বৃদ্ধদের অন্তর দুটি বিষয়ে যুবক থেকে যায়, পার্থিব জীবনের ভালোবাসা এবং দীর্ঘ আশা।’ (সহিহ বুখারি ৬৪২০)

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘আমি তোমাদের নিয়ে দারিদ্র্যের ভয় করি না, বরং ভয় করি এই যে, তোমাদের কাছে দুনিয়া যেমন প্রসারিত হবে, তেমনই তোমরা তাতে ডুবে যাবে।’ (সহিহ বুখারি ৩১৫৮)

দুনিয়ার অবস্থা বোঝা : দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানতে হবে। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী রূপ চিনে এ থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পার্থিব জীবন যাদের প্রতারিত করেছিল, আজ আমি তাদের ভুলে যাব।’ (সুরা আরাফ ৫১)

নবীজি (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হওয়ার আগে মানুষ এক কদমও নড়াচড়া করতে পারবে ন্য। তার জীবন কীভাবে কাটাল, যৌবন কী কাজে নষ্ট করল, সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করল ও কী খাতে ব্যয় করল এবং অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কতটুকু আমল করল।’ (তিরমিজি ২৪১৬)

দীর্ঘ আশা ত্যাগ করা : দীর্ঘজীবনের আশা মানুষকে নেক আমল থেকে গাফেল রাখে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ছাড়ো ওদের। ওরা খানাপিনা করতে থাকুক আর দুনিয়া ভোগ করতে থাকুক। আশা-আকাক্সক্ষা ওদের ভুলিয়ে রাখুক। অতঃপর শিগগিরই ওরা জানতে পারবে।’ (সুরা হিজর ৩)

হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘বান্দা যখন দীর্ঘ আশা করে, তখন তার আমল খারাপ হয়ে যায়।’ (তাফসিরে আজওয়াউল বায়ান ২/২৫৩)

আল্লাহর ভয় : তাকওয়া বা আল্লাহভীতি আত্মশুদ্ধির মূল ভিত্তি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা পরহেজগার এবং সৎকর্ম করে।’ (সুরা নাহল ১২৮)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে আয়েশা! তুচ্ছ গুনাহ থেকেও বেঁচে থাকো। কারণ এর জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুসন্ধানকারী নিযুক্ত আছে।’ (ইবনে মাজাহ ৪২৪৩)

পরকালের স্মরণ রাখা : মৃত্যু ও আখেরাতের স্মরণ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি হলো সে, যে মৃত্যুকে বেশি স্মরণ করে এবং তার জন্য প্রস্তুতি নেয়।’ (মুজামুল কাবির ১৩৫৩৬)

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় নিকটবর্তী, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।’ (সুরা আম্বিয়া ১)

দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করা, দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থা বোঝা, দীর্ঘ আশা থেকে নিজেকে রক্ষা করা, আল্লাহভীতি অর্জন করা এবং মৃত্যুসহ পরকালের কথা সর্বদা স্মরণ রাখা, এগুলো প্রত্যেকটি মানুষের অন্তরে এমন পরিবর্তন আনে, যা তাকে আল্লাহর পথে দৃঢ় রাখে এবং পরকালে জান্নাত লাভে সহায়ক হয়। আরেকটি বিষয় হলো, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাও অত্যন্ত জরুরি। গুনাহ মানুষের অন্তরকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। তাই ছোট বা বড় কোনো গুনাহকেই অবহেলা করা উচিত নয়। মহান আল্লাহ আমাদের এ আমলগুলো করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার