শুধু অংশগ্রহণ আর কত

এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পদকের বড় ভরসা ছিল কাবাডি ও ক্রিকেট। বছরের পর বছর এই দুই ডিসিপ্লিন থেকেই এসেছে দেশের সাফল্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারায় পড়েছে ভাটা। একের পর এক আসরে পদক হারিয়েছে বাংলাদেশ। আইচি-নাগোয়ায় এসে সেই হতাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রিকেটও। হাংজুতে পাওয়া পুরুষ ও নারী ক্রিকেট দলের ব্রোঞ্জ এবার আর ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ এশিয়ান গেমসে দেশের অর্জন থেমেছে মাত্র একটি ব্রোঞ্জে, উশুর জিন্নাত আক্তারের হাত ধরে।

২০১০ সালের এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটে স্বর্ণ জিতেছিল বাংলাদেশ। সেবারই পুরুষ কাবাডি দল পদকের বাইরে চলে যায়। এরপর আর এশিয়ান গেমসে কাবাডির পুরুষ দলের সেই পদক ফিরে আসেনি। ২০১৮ সালের জাকার্তা এশিয়াডে পদক হারায় বাংলাদেশের নারী কাবাডি দলও। এরপর আর সেই পদকও পুনরুদ্ধার করতে পারেনি তারা।

ক্রিকেটেও একইভাবে এসেছে অবনতি। ২০১০ সালে স্বর্ণজয়ের পর ২০১৪ সালের ইনচন এশিয়ান গেমসে রৌপ্য জেতে বাংলাদেশ। ২০১৮ সালের জাকার্তা এশিয়াডে ক্রিকেট ছিল না। চার বছর পর ২০২৩ সালের হাংজু এশিয়ান গেমসে পুরুষ ও নারী, দুই দলই ব্রোঞ্জ পদক জেতে। সেই দুই ব্রোঞ্জ ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়েই এবার আইচি-নাগোয়ায় গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই দলই ব্যর্থ হয়েছে। পুরুষ ক্রিকেট দল বৃষ্টির কারণে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে না পারলেও র‌্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে সেমিফাইনালে ওঠে। সেখানে পাকিস্তানের কাছে হেরে ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে নামে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই ম্যাচেও শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যায় তারা। ফলে হাংজুর ব্রোঞ্জও হাতছাড়া হয়। নারীদের ক্রিকেট দলও এবার পদক জিততে পারেনি। কাবাডিতেও ছিল না কাক্সিক্ষত সাফল্য। যে খেলাটি একসময় বাংলাদেশের এশিয়ান গেমসের অন্যতম প্রধান পদকভরসা ছিল, সেই কাবাডি থেকেই এবার শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে আইচি-নাগোয়ায় পাঠানো হয়েছিল বাংলাদেশের প্রায় ৩০০ জন ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তা। এত বড় আয়োজন ও ব্যয়ের বিপরীতে দেশের ঝুলিতে এসেছে মাত্র একটি ব্রোঞ্জ পদক। সেটিও এসেছে উশু থেকে। নারী ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে জিন্নাত আক্তার প্রথম রাউন্ডে বাই পান। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিপক্ষ নির্ধারিত ওজনের বেশি হওয়ায় ডিসকোয়ালিফাই হন। ফলে লড়াইয়ে না নেমেই সেমিফাইনালে উঠে ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করেন জিন্নাত। পরে সেমিফাইনালে চীনের ইউ ডির কাছে ৪-০ ব্যবধানে হেরে যান তিনি। তবু তার ব্রোঞ্জের গুরুত্ব কম নয়। দীর্ঘ ৪০ বছর পর এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের কোনো ক্রীড়াবিদ ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক জিতলেন। এর আগে ১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়াডে বক্সার মোশাররফ হোসেন ব্যক্তিগত ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। একটি ব্রোঞ্জের সেই অর্জনই এবার বাংলাদেশের এশিয়ান গেমসের পুরো সাফল্যের প্রতীক।

প্রত্যেক গেমসের আগে দুই থেকে তিনমাস অনুশীলন করে ভালো ফল পাওয়া যায় না। যদিও যাওয়ার আগে বিওএর কর্মকর্তারা আশার প্রদীপ জে¦লে বহর নিয়ে যান। কিন্তু সেই আশার বেলুন চুপসে যায় গেমসে যাওয়ার পরই। এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে ছুটে যান পদকের বৃথা আশায়। বছরব্যাপী অনুশীলন না করে যে পদকের প্রত্যাশা করা যায় না, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সংগঠক বলেন, ‘গেমসের আগে দুই থেকে তিন মাস অনুশীলনে পদক জেতা যায় না। প্রত্যেক বছরেই আমরা এমনটা দেখি। যেখানে অন্য দেশগুলো বছরব্যাপী অনুশীলন করে ফলাফল পাচ্ছে, সেখানে আমাদেরও এই পথ অবলম্বন করা উচিত।’ আরেক সংগঠক বলেন, ‘যেসব ইভেন্টে পদক জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, কেবল সেসব ইভেন্টগুলো বেছে অনুশীলনে রেখে তারপর গেমসে অংশ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ব্যক্তিগত ইভেন্টগুলোর ওপর জোর দেওয়া উচিত। কারণ অন্য দেশগুলো যখন সুপারসনিক গতিতে এগোচ্ছে, তখন আমরা বিপরীতমুখী।’

এবারের আসরে ক্রিকেট ও কাবাডির কাছ থেকে পদক প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়ায় হতাশা স্বয়ং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও। রবিবার পদকজয়ী উশুকা জিন্নাত আক্তারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটের কাছে প্রত্যাশা আমাদের সবারই অনেক বেশি। কারণ আমরা বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ আসরে খেলে থাকি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের একটি সুনাম রয়েছে। আমাদের ফুটবলের রেজাল্টও আশানুরূপ নয়। এবারের এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া ২২টি ইভেন্টের মূল্যায়ন করা উচিত। ইতিমধ্যে আমি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালককে (ইডি) বলেছি, প্রত্যেকটি ফেডারেশনকে চিঠি দিয়ে তাদের সার্বিক পারফরম্যান্স সবকিছু বিষয় পর্যালোচনা করে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যাতে আমরা তাদের নিয়ে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’ প্রতিমন্ত্রী যোগ করেন, ‘আমরা আর অংশগ্রহণের জন্য অংশ নিতে চাই না, সত্যিকার অর্থেই যাতে পদকের জন্য লড়াই করতে পারি সেই লক্ষ্যটা করতে হবে।’

গেমস বা প্রস্তুতির আগে দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের বিষয়ে আমিনুল হক বলেন, ‘যেকোনো টুর্নামেন্ট সামনে রেখে হঠাৎ করেই আমাদের প্রস্তুতি শুরু হয়। এটা তো কোনো জাদুর কাঠি নয় যে, কোনো ম্যাজিক করে দিলাম আর এটা রাতারাতি পদক জিতে আনলাম। তাই আমরা বছরব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের দিকেই যাব।’ এত খরচা করে প্রত্যাশিত ইভেন্ট থেকে পদক না পেয়ে ব্রোঞ্জজয়ী উশুকা জিন্নাত আক্তারের সংবর্ধনাই বলে দেয় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এখন আলোর নিচে যেন অন্ধকার।