শারদীয় দুর্গোৎসবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, দেশের প্রতিটি নাগরিক ও সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপদে বসবাস করছেন এবং নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করছেন—এই বার্তা বিশ্বকে জানাতে হবে।
একই সঙ্গে দুর্গোৎসব ঘিরে গুজব, অপপ্রচার ও সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, ছোট কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি গোষ্ঠী উৎসবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারে।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক প্রস্তুতিমূলক সভায় আজ সোমবার (০৫ অক্টোবর) জেলা প্রশাসক এসব কথা বলেন।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিশ্বের কাছে দেখাতে চাই, এই দেশের প্রতিটি নাগরিক, প্রতিটি সম্প্রদায়, প্রতিটি জাতিগোষ্ঠী নিরাপদ। তারা নিরাপদে বসবাস করে, নিরাপদে তাদের উৎসব পালন করে।’
দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদ্যাপন কমিটি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ছোট কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
সভায় চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, মহানগরের বাইরে চট্টগ্রাম জেলায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ২ হাজার ২৮৭টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করে পুলিশ সুপার বলেন, এ ধরনের তৎপরতা সহ্য করা হবে না এবং নজরদারি থাকবে। বিভ্রান্তিকর কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লে পূজা উদ্যাপন কমিটিগুলোকে দ্রুত প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
গুজব ও অপপ্রচারকে দুর্গোৎসবের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, ছোট কোনো ঘটনাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত করে প্রচারের চেষ্টা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পূজা উদ্যাপন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে দ্রুত সত্য তথ্য তুলে ধরতে হবে। গুজব ও অপতথ্য শনাক্তে সাইবার ইউনিট কাজ করবে।
পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা রাখার পরামর্শ দেন জেলা প্রশাসক। স্বেচ্ছাসেবকদের রোস্টার করে দায়িত্ব দেওয়া এবং তাঁদের সহজে শনাক্ত করতে আলাদা পোশাক, কটি বা আর্মব্যান্ড ব্যবহারের কথাও বলেন তিনি।
স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা ও মুঠোফোন নম্বর সংশ্লিষ্ট থানায় জমা দিতে পূজা কমিটিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান পুলিশ সুপার। মণ্ডপের কমিটি বা জায়গা-জমি নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে পূজার আগেই তা মীমাংসার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রতিমা তৈরি ও পরিবহন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক। সম্ভব হলে দিনের আলোয় প্রতিমা মণ্ডপে আনা এবং সূর্যাস্তের আগেই বিসর্জন শেষ করার পরামর্শ দেন তিনি।
বিসর্জনস্থলে পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের কথা জানানো হয় সভায়। বিসর্জনে ব্যবহৃত যানবাহনের ফিটনেস এবং চালকের শারীরিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার তাগিদও দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা চাই না, এই উৎসবের আনন্দের মধ্যে কোনো বিষাদ আসুক। আমরা চাই, সবকিছু আনন্দমুখর পরিবেশে হোক।’
দুর্গোৎসবের নিরাপত্তার পাশাপাশি এর ঐতিহ্য ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ধরে রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। উৎসবের নিজস্ব সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও উদারতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমাদের মনটা একটু বড় করতে হবে। আমরা যদি মনটাকে বড় করতে না পারি, তাহলে আমাদের পরের প্রজন্ম কী শিখবে?’
শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।
সভায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।