রাজধানীতে আবাসন সংকট  

সবার জন্য ঘর এই হোক প্রত্যয়

একটি বাড়ি কিংবা ঘর শুধু বসবাসের কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, প্রকৃতপক্ষে এটি যাপিত জীবনের গভীর অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দু। রবীন্দ্রনাথের পূরবী কাব্যের ‘আশা’ কবিতার ‘বহুদিন মনে ছিল আশা/ধরণীর এক কোণে/রহিব আপন-মনে;/ধন নয়, মান নয়, একটুকু বাসা/করেছিনু আশা...’ মধ্যাংশের এই পঙ্ক্তিগুলোর মধ্যে যে অভিব্যক্তি নিহিত রয়েছে তা মানব জীবনের নিরাপদ আবাসনের আকুতিরই প্রকাশ। ৫ অক্টোবর  বিশ্ব বসতি দিবসে ‘সংকটের নগরে মাথা গোঁজার যুদ্ধ’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরের মলাটের মূল প্রতিবেদনের পাশাপাশি এর পার্শ্ব প্রতিবেদনগুলোতে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে প্রতীয়মান হয় আবাসন সংকট কত প্রকট হয়ে উঠেছে নগর জীবনে। রাজউক চেয়ারম্যান, আবাসন শিল্পের শীর্ষজন, নগর পরিকল্পনাবিদ প্রত্যেকেরই সাশ্রয়ী আবাসনের অভিমতের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নেই। তারা যথার্থই বলেছেন, নির্মাণ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উন্নত সামাজিক পরিসরে অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসিক মডেল প্রয়োজন।

বাস্তবতা হলো, জাতীয় অর্থনীতিতে আবাসন শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও খাতটি নানা সংকটের মুখোমুখি। জাতীয় অর্থনীতিতে আবাসন খাতের অবদান-আয় উল্লেখযোগ্য। এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ জড়িত। রড, সিমেন্ট, সিরামিকসহ প্রায় অনেক  সহযোগী শিল্প ও সেবা খাত এর ওপর নির্ভরশীল। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামলিয়ে নিরাপদ ও পরিকল্পিত নগর আবাসন গঠনে এই শিল্পের ভূমিকাও স্মরণযোগ্য। সেই নিরিখে সরকারের সহযোগিতামূলক কার্যক্রম কতটা, এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। নির্মাণ সামগ্রীর দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই এর বিকাশ তো দূরের কথা,অস্তিত্ব টেকানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। নীতিগত পরিবর্তনের ধারায় ইতিবাচকতার চেয়ে নেতিবাচক প্রবণতা কাম্য নয়। আবাসন  খাতের অমসৃণ পথ নগরে বসবাসকারীদের অনুকূল নয়। তারপরও প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে এ খাত  সংশ্লিষ্টরা বসবাসের জন্য ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির কারণে অনেকেই ‘একটুকু বাসা/করেছিনু আশা’র প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছেন কিংবা পারছেন। আমরা মনে করি, এ জন্য সরকারের সহায়তা অপরিহার্য।

এ খাতে বিদ্যমান সংকট নিরসনে সরকারের সর্বাধিক নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। জাতিসংঘের মানব বসতি কর্মসূচি এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, ‘সর্বজনীন আবাসন, টেকসই নগরায়ণ’। আমাদের প্রেক্ষাপটে এ প্রতিপাদ্য আরও গুরুত্ববহ। নানা কারণে মহানগর-নগরে জনচাপ বাড়ছে। বাড়ি বাড়ছে যতটা এরচেয়ে অধিক হারে বাড়ছে ভাড়াটিয়া। শুধু তা-ই নয়, নগরের আবাসন সংকট কেবল  ভাড়া ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষ যে পরিসরে ভাড়া থাকে, তা প্রয়োজনের নিরিখে অনেক সংকুচিত। এ ব্যাপারে খোদ সরকারি সংস্থা বিবিএসের তথ্যই বলে মানুষের বসবাসের চিত্র যেন অনেকটাই নিরাশ্রয়ী গৃহীর মতো। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬-এর উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে সরকার সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত, নিরাপদ ও মৌলিক সেবা-পরিষেবা সংবলিত বাসস্থান নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার এবং এ অধিকার নিশ্চিত করতেও  সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই অঙ্গীকার-প্রত্যয়ের সাধুবাদ জানাই।

রাজধানীতে বিদ্যমান বহুমুখী সংকটের মধ্যে মানুষের মাথা গোঁজার যুদ্ধ নিরসনের ক্ষেত্রে সমন্বিত প্রয়াস যেমন জরুরি, তেমনি সমগুরুত্বে সামনে আসে বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টিও; যা মহানগর-নগর জীবনে কিছুটা হলেও ফেরাতে পারে স্বস্তি। মনে রাখা দরকার, শুধু একটি ঘরই নয়, এর সঙ্গে নিরাপদ-সাশ্রয়ী-পরিবেশসম্মত ও মৌলিক সেবা-সুবিধাসম্পন্ন বাসস্থান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রও করতে হবে উর্বর। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট আবাসন শিল্পের বিদ্যমান সংকট নিরসন করে মানুষের নিরাপদ বসবাসের বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজে অস্থিরতার ছায়া প্রলম্বিত হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। দ্রুত নগরায়ণ, মানুষের স্বস্তি এবং আধুনিক জীবনযাত্রার চাহিদা  বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আবাসন খাতের পথ মসৃণ করতে দূরদর্শী পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নে মনোযোগ গভীর করতে হবে জাতীয় স্বার্থেই। চিলির খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ী কূটনীতিক-রাজনীতিবিদ পাবলো নেরুদা যথার্থই বলেছেন, ‘একটি ঘর তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেখানে মানুষের হাসি ও আনন্দ প্রতিধ্বনিত হয়’। মানুষের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত হোক এবং মানুষ তার নিজের ঘরে শান্তি খুঁজে পাক। ঘরের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য ঘর; এই হোক আমাদের প্রত্যয়।