পরিচ্ছন্নদের সামনে আসার পথ সুগম হোক  

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির রাজনীতির ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামের সঙ্গে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, সততা, শৃঙ্খলা ও জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার একটি রাজনৈতিক চিন্তা যুক্ত হয়ে আছে। সেই আদর্শকে বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় এগিয়ে নিতে হলে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, সংগঠনের প্রতিটি স্তরে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যাদের ব্যক্তিগত আচরণ, সাংগঠনিক নিষ্ঠা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক দলীয় রাজনীতির প্রতি আস্থা তৈরি করতে পারে। বিএনপির সামনে তাই গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক প্রশ্ন দলের ভবিষ্যৎ শক্তি কি শুধু সংখ্যায়, নাকি আস্থাযোগ্য নেতৃত্বের গুণগত মানেও? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সদ্য সাবেক সদস্য সচিব হাজি মো. মোস্তফা জামানের মতো আরও অনেক নেতার রাজনৈতিক ভূমিকা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা নতুন করে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের বিদ্যমান আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন আমিনুল হক এবং সদস্য সচিব ছিলেন মো. মোস্তফা জামান; বিএনপি জানিয়েছে, অচিরেই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। এই বাস্তবতায় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রশ্নটি এখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে। কেন মোস্তফা জামানসহ আরও কয়েকজনকেই নতুন দায়িত্বের আলোচনায় রাখা যেতে পারে। প্রথমত মোস্তফা জামানের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

২০২৫ সালের অসংখ্য উঠান বৈঠকে তাকে প্রধান অতিথি হিসেবে দেখা যায়, যেখানে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উপস্থিতও ছিলেন। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও তার সক্রিয়তার নজির রয়েছে। তার সমর্থক ও শুভাকাক্সক্ষীরা তাকে সততা, সহজ-সরল রাজনৈতিক আচরণ এবং কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মূল্যায়ন করেন। শহীদ জিয়ার আদর্শের সঙ্গে তার বর্তমান নেতৃত্বের যোগসূত্র শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনীতির অন্যতম শিক্ষা ছিল দেশ ও জনগণের স্বার্থকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রাখা। সেই রাজনৈতিক দর্শনকে বর্তমান সময়ে কার্যকর করতে হলে বিএনপির সংগঠনেও প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে সংগঠনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সক্ষমতা দেখাতে পারেন। এখানেই মোস্তফা জামানের মতো নেতাদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি রাজনৈতিক দল শুধু শীর্ষ নেতৃত্ব দিয়ে শক্তিশালী হয় না। শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক দর্শন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করেন সাংগঠনিক নেতারা। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ার পারসন তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যখন রাষ্ট্র ও দল পরিচালনায় জনসম্পৃক্ততা, শৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের কথা বলছে, তখন সেই রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে আস্থাভাজন নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি ঢাকার বিভিন্ন সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির পাশাপাশি অন্য কিছু সাংগঠনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে নতুন নেতৃত্বের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য; সাংগঠনিক শৃঙ্খলা; কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ; সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা; ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে সংগঠনকে রাখার মানসিকতা; নগরবাসীর নাগরিক সমস্যা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ এবং সর্বোপরি একটি পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি। এই মানদণ্ডে মোস্তফা জামানসহ পূর্ববর্তী দায়িত্ব পালনের রেকর্ড দলীয় নেতৃত্ব চাইলে অনেককেই পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। এছাড়াও তাকেসহ আরও কয়েকজনকে এখনই কেন বৃহত্তর দায়িত্বের কথা ভাবা যেতে পারে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক সম্পদ হলো জনগণের আস্থা। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করে ক্ষমতার দায়িত্বে আসার পর দলীয় সংগঠনকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জনমুখী করা জরুরি। বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে তারেক রহমান ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, এটি দলের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক পর্যায়ের সূচনা করেছে। এই নতুন পর্যায়ে শুধু পুরনো সাংগঠনিক কাঠামো নয়, যোগ্যতা, সততা, আস্থা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সেই বিবেচনায় মোস্তফা জামানকে কেবল সাবেক সদস্য সচিব হিসেবে দেখলে তার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার পূর্ণ মূল্যায়ন হয় না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার চারপাশের সংগঠকরা। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করতে হলে এমন নেতাদের সামনে আনা প্রয়োজন, যারা দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সক্ষম এবং মাঠপর্যায়ে কর্মীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখতে পারেন। শহীদ জিয়ার দেশপ্রেম ও সততার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতিতে ধারণ করতে হলে শুধু অতীতের আদর্শ স্মরণ করলেই হবে না; সেই আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিক আচরণ ও সাংগঠনিক সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।

সেই কারণেই আজকের প্রশ্নটি শুধু ‘মোস্তফা জামান আহ্বায়ক হবেন কি না’ এতটা সরল নয়। মূল প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি এমন নেতৃত্বকে সামনে আনতে চায়, যাদের মাধ্যমে দলীয় শৃঙ্খলা, সততা, জনসম্পৃক্ততা এবং আস্থার রাজনীতি আরও শক্তিশালী হবে? যদি উত্তরটি ইতিবাচক হয়, তাহলে মোস্তফা জামানের মতো নেতাদের অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতাকে দ্রুত মূল্যায়ন করে বৃহত্তর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি দলের চেয়ারম্যানের বিবেচনায় আসতে পারে। শহীদ জিয়ার আদর্শের দেশপ্রেম, তারেক রহমানের নেতৃত্বের নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং জনগণের আস্থার রাজনীতিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হলে যোগ্য, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির এবং সাংগঠনিকভাবে পরীক্ষিত নেতৃত্বকে আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজ করার সুযোগ দেওয়া সময়ের দাবি।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক। চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ (গভর্নিং বডি)