জাদুকরের শেষ খেলা

বুয়েনস আয়ার্সের এস্তাদিও মাস মনুমেন্তালের আকাশটা কি আজ একটু বেশিই মেঘলা? নাকি ৮৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার গ্যালারিতে জমা হওয়া ভালোবাসার উত্তাপ বাতাসকে ভারী করে তুলেবে? উত্তর যাই হোক, পুরো বিশ্ব ফুটবলের চোখ আজ আর্জেন্টিনার রাজধানী শহরের এই ঐতিহ্যবাহী স্টেডিয়ামে। ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও ঈশ্বরপ্রদত্ত ধ্রুবতারাটি আজ শেষবারের মতো গায়ে চাপাবেন আলবিসেলেস্তাদের বিখ্যাত আকাশি-সাদা জার্সি। বেনিনের বিপক্ষে এই বিশেষ প্রীতি ম্যাচ দিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলের দুই দশকের দীর্ঘ, মহাকাব্যিক ও রোমাঞ্চকর ভ্রমণের ইতি টানছেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

মাঠে নামার আগে উন্মোচিত হওয়া মেসির বিশেষ বিদায়ী বুটে স্পষ্টাক্ষরে খোদাই করা দুটি শব্দ “এল আলতিমো ট্যাঙ্গো (শেষ নাচ)। আর জার্সিতে শোভা পাচ্ছে সোনার হরফে লেখা স্মারকচিহ্ন এবং আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকার বিখ্যাত ‘মে সূর্য’। প্রতিটি সুতায় যেন জড়িয়ে আছে ২১ বছর, ২০৮টি ম্যাচ এবং ১২৫টি গোলের অমর এক উপাখ্যান।”

মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার এই ভালোবাসার গল্পটা অবশ্য সবসময় এত মধুর ছিল না। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটু একটু করে গড়ে উঠেছিল এই প্রেম। ২০০৪ সালে স্পেনের লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে যখন জন্মভূমির জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন, তখন আর্জেন্টিনার ফুটবল কর্তারা তার সঠিক নামটাও জানতেন না; ফ্যাক্স পাঠিয়েছিলেন ‘মেচি’ বানানে।

পরবর্তী এক যুগে সেই ছেলেটিকেই বইতে হয়েছে এক পুরো জাতির স্বপ্নের পাহাড়সম চাপ। তিন-তিনটি কোপা আমেরিকা এবং ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে গিয়ে যে অসীম যন্ত্রণা তিনি সহ্য করেছিলেন, তা হয়তো অন্য কাউকে ধ্বংস করে দিত। সমর্থকদের নির্মম কটাক্ষ ও ‘পেচো ফ্রিও’ (হৃদয়হীন) অপবাদের তকমা সয়ে ২০১৬ সালে ক্ষোভে ও দুঃখে যখন আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা দেন, তখন পুরো আর্জেন্টিনা কেঁদে উঠেছিল। উপলব্ধি করেছিল ক্ষতটা মেসির একার ছিল না, কষ্ট পাচ্ছিলেন তারাও।

সমর্থকদের আকুল আবেদন, রাজপথের মিছিল ও তৎকালীন প্রেসিডেন্টের অনুরোধের টানে প্রিয় নীল-সাদা জার্সিতে ফিরে এসেছিলেন লিও। আর সেই ফিরে আসার দ্বিতীয় অধ্যায়টিই রূপ নেয় ক্রীড়া ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফিনিক্স পাখির গল্পে। ২০১৮ বিশ্বকাপের চরম ব্যর্থতার পর যখন তরুণ অনভিজ্ঞ কোচ লিওনেল স্কালোনির হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, তখন অনেকেই ভুরু কুঁচকেছিলেন। কিন্তু স্কালোনিই গড়ে তোলেন সেই পরাক্রমশালী ‘লা স্কালনেতা’ যেখানে সতীর্থরা মেসির জন্য রক্ত-ঘাম ঝরাতে দ্বিধা করতেন না। স্কালোনির সুসংগঠিত দলের কাপ্তান হয়ে মেসি একে একে জয় করেন ২০২১ কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা। যে ট্রফির জন্য কৈশোর থেকে নিঃশব্দে কেঁদেছেন, তা অবশেষে পরম মমতায় তুলে নেন নিজের হাতে। দীর্ঘ ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে কাতার বিশ্বকাপের মঞ্চে ট্রফি উঁচিয়ে ধরে নিজেকে নিয়ে যান সর্বকালের সেরা বিতর্কের ঊর্ধ্বে।

তবে ফুটবলের রূপকথা সবসময় সুখে শেষ হয় না। ২০২৬ সালে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে টানা ৯ ম্যাচে গোল করে, টুর্নামেন্ট ইতিহাসে রেকর্ড ২১টি গোলের নতুন মাইলফলক গড়ে আর্জেন্টিনাকে আবারও ফাইনালে তোলেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। কিন্তু ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে শেষ রক্ষা হয়নি। পরাজয়ের বেদনায় মাঠেই বুট খুলে অঝোরে কেঁদেছিলেন মহাতারকা। বিশ্বকাপ ফাইনালের ঠিক দুদিন পর, ২১ জুলাই ২০২৬ নিজের ড্রেসিংরুমে বসে বিদায় চিঠি লিখে ফেলেছিলেন মেসি। কিন্তু সেই শোক কাটতে না কাটতেই ৮ আগস্ট পরলোক গমন করেন তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, পথপ্রদর্শক ও পিতা হোর্হে মেসি। বাবাকে হারানোর চরম ব্যক্তিগত যন্ত্রণা মেসির বিদায়ের সিদ্ধান্তকে আরও চিরস্থায়ী করে তোলে। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত আবেগঘনবার্তায় মেসি লেখেন, ‘আমার আর কিছু দেওয়ার নেই আমার যতটুকু সামর্থ্য ছিল, তার সবটুকু দিয়ে দিয়েছি।’

আজকের দিনটি শুধুই বেনিনের বিপক্ষে একটি সাধারণ প্রীতি ম্যাচ নয়; এটি ফুটবলের এক মহান রাজপুত্রকে তার নিজের ঘরের মাঠে দেওয়া রাজকীয় সংবর্ধনা। যে ৮৫ হাজার ভক্ত টিকিট কেটে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়েছেন, তারা জানেন আজ বল পায়ে লিওর প্রতিটি ছোঁয়া ইতিহাস হয়ে থাকবে। ৯০ মিনিট না খেলালেও চলবে, কেবল ওই গাঢ় ১০ নম্বর জার্সিতে শেষবার মাঠ চষে বেড়ানো দৃশ্যটাই যে স্মৃতির ক্যানভাসে অমর হয়ে থাকবে আজীবন।

আজকের ম্যাচ শেষে আলো নিভে যাবে মনুমেন্তালের। কিন্তু রোজারিওর সেই রোগা-পাতলা কিশোর থেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার হওয়ার যে গল্প লিওনেল মেসি লিখে গেছেন, তা কোনো দিন ফিকে হবে না।

বিদায় অধিনায়ক, বিদায় লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা তো বটেই, পুরো বিশ্বফুটবল আজ একসুরে বলবে ‘গ্রাসিয়াস, লিও!’