ফুটবল ছেড়ে কি করবেন লিওনেল মেসি

আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের শেষ ম্যাচটি খেলতে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডধারী এই কিংবদন্তী তারকা বুয়েনস আইরেসের 'মনুমেন্তাল' স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে অবসর নিতে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক ফূটবল থেকে।  
 
স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের ছয় সপ্তাহ পর ৩১ আগস্ট তিনি জানান, জাতীয় দলকে আর দেওয়ার মতো কিছু তার কাছে অবশিষ্ট নেই। কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য জোর দিয়ে বলছেন, মেসি যদি কখনো খেলা চালিয়ে যেতে চান, তবে তার জন্য দরজা সবসময় খোলা এবং সিদ্ধান্ত বদলালে লজ্জার কিছু নেই। কিন্তু জাতীয় দলের সেই অধ্যায়টি আপাততঃ শেষ বলেই মনে হচ্ছে।

তবে মেসির ক্লাব ক্যারিয়ার এখনো চলছে। ইন্টার মায়ামির সাথে তার চুক্তির মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত। অবশ্য প্রতি বছর এই চুক্তিটি পর্যালোচনা করা হয়। তবে মেসির ঘনিষ্ঠদের কেউই আশা করেন না যে, বাধ্য হওয়ার একদিন আগেও তিনি মাঠ ছাড়বেন। এমনকি শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত বোধ করলে তিনি যে চুক্তির মেয়াদ আরো বাড়াবেন, সে সম্ভাবনাই বেশি।

তার খেলা ছাড়ার পরের পরিকল্পনা কী—তা নিয়ে আশপাশের মানুষদের জিজ্ঞেস করলে তারা হেসে ফেলেন। কারণ, মেসি কখনোই আগামী ম্যাচের চেয়ে বেশি দূর নিয়ে ভাবেন না।

তবুও ভবিষ্যতের একটা রূপরেখা এখনই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফুটবল ছাড়া বেঁচে থাকা মেসির পক্ষে কঠিন, তাই তিনি ফুটবলেই থাকবেন। তবে তার ব্যবসার পরিধি খেলার জগত ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত।
 
মেসি আগে কোনো ক্লাবের স্পোর্টিং ডিরেক্টর বা সভাপতির উপদেষ্টা হতে চেয়েছেন—যাতে প্রচুর ভ্রমণ আর ফোনে কথা বলার ঝামেলা এড়িয়েও নীতিগত সিদ্ধান্তের কাছাকাছি থাকা যায়। কিন্তু সম্প্রতি যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলে মেসি মালিক হওয়ার বিকল্পটিই বেছে নেন। একজন কোচকে প্রতি সপ্তাহের ম্যাচের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে হয় এবং তাকে অনেক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়, যা মেসির পছন্দ নয়। অপরদিকে একজন মালিক একটু পিছন থেকে ক্লাবের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা ঠিক করেন। তবে মেসি এমন একজন মালিক হতে চান, যিনি শুধু ম্যানেজার নিয়োগের অনুমোদন দিয়ে সরে দাঁড়াবেন না, বরং প্রতিটি বিষয়েই সক্রিয় থাকবেন।

এই পরিকল্পনার শুরুটা ইতোমধ্যে স্পেনে ক্লাবের মালিকানা কেনার মধ্য দিয়ে শুরু করেছেন মেসি। বার্সেলোনার কাছেই পঞ্চম বিভাগের দল 'ইউই কর্নেয়া'কে গত এপ্রিলে কেনেন তিনি। এই ক্লাবটি মূলত এক তরুণ খেলোয়াড় তৈরির নার্সারি। অতি সম্প্রতি, গত ১ অক্টোবর স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের দল 'সিডি এলদেন্স'-এর নতুন মালিক হয়েছেন তিনি। এলদেন্সই হতে যাচ্ছে মেসির ফুটবল সাম্রাজ্যের মূল চালিকাশক্তি। এই মৌসুমে দলটিকে রেলিগেশন থেকে বাঁচানোই মূল লক্ষ্য, আর সে কারণেই নতুন মালিক আসার সাথে সাথে ভিয়ারিয়ালের প্রাক্তন কোচ হাভি কালেহাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা হলো—মেসি নিজে পূর্ণ সময় দেওয়ার আগ পর্যন্ত তার বিশ্বস্ত মানুষদের মাধ্যমে ক্লাব দুটি পরিচালনা করা, যারা মেসি ও ক্লাবের মধ্যে সংযোগ হিসেবে কাজ করবেন। 
মেসির নামের প্রভাবও ইতোমধ্যেই টের পাওয়া যাচ্ছে। মালিক হওয়ার মাত্র দু-এক দিনের মধ্যেই প্রায় এক ডজন স্পন্সর এগিয়ে এসেছে এলদেন্সের জন্য।
 
উরুগুয়েতে লুইস সুয়ারেজের সাথে মিলে মেসি ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন 'দেপোর্তিভো এলএসএম'। নিজেদের প্রথম মৌসুমেই দলটি দেশের তৃতীয় বিভাগে খেলার সুযোগ অর্জন করে। শুরুতে আরও কয়েকটি ক্লাব কিনে একটি নেটওয়ার্ক তৈরির কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু ক্লাবগুলোকে ওপরের বিভাগে তুলে আনতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় সেই চিন্তাটি আপাতত বাদ হয়ে গেছে। বর্তমানে মেসির মূল মনোযোগ এলদেন্সকে স্প্যানিশ লা লিগায় প্রতিষ্ঠিত করার দিকে।

মায়ামির সাথেও তার একটি স্থায়ী সংযোগ রয়েছে। ইন্টার মায়ামির সাথে চুক্তির অংশ হিসেবে, অবসর নেওয়ার পর ক্লাবটির কিছু শেয়ারের মালিক হবেন তিনি। তবে নিজের আলাদা কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি খোলার পরিকল্পনা তার নেই।

মেসি কি তার শৈশবের ক্লাব, রোসারিওর 'নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ'-এ ফিরে যেতে পারেন? এই বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই আলোচনা হয়নি।
তার ঘনিষ্ঠদের কেউ এমনটা আশা করেন না। মেসির সবকিছুই ইউরোপ ও মায়ামিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আর সমুদ্রের কাছে বার্সেলোনার কাসতেলদেফেলসে তার পরিবারের জন্য একটি সুন্দর বাড়ি অপেক্ষা করছে।
 
নিওয়েলস ক্লাবের সাথে মেসির দূরত্ব অবশ্য তৈরি হচ্ছে না, কারণ এই বছরের 'মেসি কাপ'-এ অংশ নেওয়া ১৬টি একাডেমির একটি হলো নিওয়েলস।
ক্লাবের মালিক হওয়া যেমন তার একটি আগ্রহের জায়গা, ঠিক তেমনি জুনিয়র বা যুব ফুটবল তার আরেক ভালোবাসা। ছেলের ম্যাচ দেখতে মাঠে যাওয়া এবং মেসি কাপে তার নিয়মিত উপস্থিতিই এর প্রমাণ।

মাঠের বাইরে মেসি যে ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরি করেছেন, তা থেকেই বোঝা যায় কেন গত জুনে 'ফোর্বস' তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করেছিল। শুধু শেষ বছরেই ফুটবল ও ব্যবসা থেকে তার আয় ছিল প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ডলার। তার সবচেয়ে পরিচিত চুক্তি হলো ২০১৭ সালে অ্যাডিডাসের সাথে করা আজীবন মেয়াদী চুক্তিটি।

এছাড়া তার ব্যবসায়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ হলো এমআইএম হোটেলস। ইবিজা থেকে অ্যানডোরা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা ছয়টি বুটিক হোটেলের একটি চেইন এটি। 

নিজের জন্মশহর রোসারিওতে তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান 'কারাসকো এম' নামের একটি আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে, যেখানে পারানা নদীর তীরে ২৪টি বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। এর বিক্রির দায়িত্বে রয়েছে ডি মারিয়ার রিয়েল এস্টেট এজেন্সি।

তিনি 'এল ক্লাব দে লা মিলানেসা' নামের একটি রেস্তোরাঁ চেইনেরও অংশীদার, যা ক্যাটালোনিয়া অঞ্চলে পাঁচটি শাখা খোলার পরিকল্পনা করছে এবং প্রথমটি খুলছে কাসতেলদেফেলসে।

এছাড়া ড্রিংকওয়্যার ব্র্যান্ড 'স্ট্যানলি'র সাথে তার নিজস্ব 'মেতে' কালেকশন রয়েছে। এটি কোনো অ্যাথলেটের সাথে ব্র্যান্ডটির প্রথম বহু-বছরের চুক্তি, যেখানে মেসি নিজে কন্টেইনারের উপাদান ও রঙ নির্বাচনে মতামত দিয়েছেন।

ব্যবসায়িক বিশ্বের সাথে মেসি তার সম্পর্ক নিজের মতো করে নির্ধারণ করেন, কেউ তার ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারে না। গত বছরের নভেম্বরে মায়ামিতে 'আমেরিকা বিজনেস ফোরাম'-এ মেসি বলেছিলেন: "ব্যবসা এমন একটা বিষয় যা আমাকে আকর্ষণ করে। আমি আরো শিখতে চাই, কারণ আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না এবং কেবল যাত্রা শুরু করছি।"

তিনি ফুটবলে নিজের আগ্রহকে টিকিয়ে রাখার নতুন নতুন সুযোগ খোঁজার পাশাপাশি, তার চারপাশের মানুষেরা ইতোমধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও চিত্তাকর্ষক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।