আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও শৈশব-কৈশোর নিয়ে জানতে চাই। বাবা-মায়ের ব্যাপারেও যদি বলেন।
রিফাত চৌধুরী : আমার জন্ম হয়েছে পুরান ঢাকার চকবাজারের রহমতগঞ্জে। ১৯৬২ সালে। সেই সূত্রে আমার ছেলেবেলাটা আর শৈশবটা পুরান ঢাকাতেই কেটেছে। আমার মা হলো শহরের মেয়ে আর আমার বাবা হলো গ্রামের ছেলে। সেই দিক থেকে পৈতৃক সূত্রে আমার গ্রামের বাড়ি হলো কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি। আমরা ছেলেবেলা থেকেই বিভিন্ন সময় সেখানে গিয়েছি, থেকেছি কিন্তু বেশিরভাগ সময় কেটেছে পুরান ঢাকায়।
আপনি পুরান ঢাকায় কেন থাকতেন?
রিফাত চৌধুরী : পুরান ঢাকা হলো আমার নানির বাড়ি। আমার নানির সন্তান হলো চার মেয়ে। তার কোনো ছেলে ছিল না। আমার মা হলো তার শেষ মেয়ে। এ রকম করে চার মেয়েই তার সঙ্গে থাকত। একান্নবর্তী পরিবারের মতো আমরা থাকতাম।
আপনার বাবা কী করতেন?
রিফাত চৌধুরী : বাবা মেডিসিনের বিজনেস করতেন। মিটফোর্ড মেডিসিন মার্কেটে তার একটা পাইকারি ওষুধের ব্যবসা ছিল। আগে গ্রামে পাটের ব্যবসা করতেন। শহরে এসে মেডিসিনের ব্যবসা শুরু করেন।
আপনি কবিতা লেখা শুরু করলেন কীভাবে?
রিফাত চৌধুরী : কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম কবি আবিদ আজাদের কবিতা পড়ে। আমি জানতাম আবিদ আজাদ আমাদের গ্রামের। ছোটবেলায় নিজেও ছড়াটড়া লিখতাম। তো দীর্ঘদিন আমি পত্রিকায় ছাপা হওয়া তার কবিতার কাটিং রাখতাম। আমি মনে করি, কিছু কিছু মানুষের সান্নিধ্যে আসলে জীবনের গতি পরিবর্তন হয়ে যায়। আবিদ আজাদ ছিলেন সেরকমই একজন।
আবিদ আজাদের কবিতার কাটিং রেখে কী করতেন?
রিফাত চৌধুরী : আমার সংগ্রহে রেখে দিতাম। আপনি জেনে আশ্চর্য হবেন, আবিদ আজাদের একটা কবিতার বই বেরিয়েছিল—আমার মন কেমন করে। সেই বইয়ের অধিকাংশ কবিতাই ছিল আমার সেই পত্রিকা কাটিং করে সংগ্রহ করে রাখা কবিতা, যেগুলো আবিদ আজাদের নিজের সংগ্রহেই ছিল না! অধিকাংশ, চারভাগের তিনভাগ কবিতাই আমি সরবরাহ করে দিয়েছি।
আবিদ আজাদের সঙ্গে প্রথম কোথায় দেখা হয়েছিল আপনার?
রিফাত চৌধুরী : একদিন আবিদ আজাদ যেখানে কাজ করেন, বাংলাদেশ রেডিও অফিসে আমি চলে গেলাম। সেখানে তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ঢাকায়। তারপর তিনিও যেহেতু কিশোরগঞ্জ যেতেন, আমিও যেতাম; দুই জায়গাতেই আমাদের নিয়মিত দেখা হতে থাকল। এক পর্যায়ে আমি তার পরিবারের একজন সদস্যের মতোই হয়ে গিয়েছিলাম। আবিদ আজাদের বাবা আবিদ আজাদের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে আমাকে বিভিন্ন গ্রামে চষে বেড়াতেন। আপনি শুনলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন, আমাদের ঠিক করা সম্বন্ধেই আবিদ আজাদের বিয়েও হয়ে গেল!
আবিদ আজাদের প্রেসে কি আপনি চাকরি করতেন?
রিফাত চৌধুরী : আমি ওই প্রেসের সাথে এত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছিলাম যে আমি ভাবতে শুরু করেছিলাম ওটার মালিকই আমি। আবিদ আজাদের জন্য আমি অপেক্ষা করে থাকতাম, যে উনি কখন আসবেন। নানা দিকে আড্ডা দিয়ে উনি আসতেন, আর উনার অপেক্ষায় দিনভর আমাকে প্রেসেই থাকতে হতো। চাকরি করিনি, কিন্তু একসময় প্রেসেই আমি থেকেছি, খেয়েছি। প্রেস থেকেই এসব ব্যবস্থা করা হতো।
আবিদ আজাদের নাম নিয়ে কী বলবেন বলছিলেন?
রিফাত চৌধুরী : আবিদ আজাদের কিন্তু আগে দু তিনটা নাম ছিল। একটা ছিল—সুমন আল ... কী যেন, হাবিবুর রহমান এবং আরও একটা, এসব নামে তিনি লিখতেন। শেষে রফিক আজাদ তার বন্ধুর নামকরণ করলেন—আবিদ আজাদ। তখন এরকম একটা প্রচলন ছিল, বন্ধুর কাছাকাছি নামগ্রহণ, যেমন হেলাল হাফিজ থেকে হাসান হাফিজ।
আবিদ আজাদের কবি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে শিল্পতরু প্রেসে আপনাদের একটা আড্ডা হতো। সেই আড্ডায় কারা যেতেন?
রিফাত চৌধুরী : কবি পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক ছিল আবদুল মান্নান সৈয়দ, মোস্তফা আনোয়ার, আবদুর রউফ সরকার—উনি হলেন কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর ছোট ভাই—জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টাফ আর্টিস্ট ছিলেন—তার অফিসেও আমরা যেতাম। সহকারী সম্পাদক হিসেবে আমার নাম ছাপা হতো। আড্ডায় আবদুল মান্নান সৈয়দ, মোস্তফা আনোয়ার আসতেন। তারপর মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। মোস্তফা মহীউদ্দিন, শিহাব সরকার, ত্রিদিব দস্তিদার আসতেন। আমাদের বুলবুল চৌধুরী... আরও অনেকেই আসতেন।
এটা কি গোছানো কোনো আড্ডা ছিল? নির্দিষ্ট সময়ে সবাই আসত এমন?
রিফাত চৌধুরী : না। নির্ধারিত কিছু ছিল না। কেউ সপ্তাহান্তে আসত, কেউ প্রায় প্রতিদিনই। কোনো কোনো দিন কাকতালীয়ভাবেই অনেকে চলে আসতেন। বলতে ভুলে গেছি, রাজু আলাউদ্দিন, কাজল শাহনেওয়াজ ওরাও নিয়মিত আসত। আরও আসত—আসলাম সানী, সম্প্রতি মারা গেল, ছড়াকার আমীরুল ইসলাম।
আপনি নীলক্ষেত বস্তিতে বাসা ভাড়া নিলেন কত সালে?
রিফাত চৌধুরী : সেটা ১৯৮০ সালের দিকে। আসলে হয়েছিল কী, আমি তখন কিছুটা নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম। নেশাটেশা করার জন্যই আর কি নীলক্ষেত বস্তিতে একটা বাসা নিলাম। এখানে সব বন্ধুরা আসত আরও যারা আসক্ত ছিল। ভাড়াও খুব বেশি ছিল না। আর বাড়িওয়ালা আমার কাছ থেকে ভাড়াও নিত না। কারণ সেও এসে যোগ দিত। এ রকম আরও অনেকেই কাদা-টাদা মাড়িয়ে চলে আসত আর কী। বলে না, কবি হলো এমন একজন মানুষ যে গাড়লকেও সঙ্গ দেয়! সঙ্গ দেওয়ার জন্যই ওই বাসাটা ভাড়া নিয়েছিলাম।
আপনার নীলক্ষেত বস্তির বাসায় কারা আসত?
রিফাত চৌধুরী : আমি তো থাকতামই। আরও অনেকেই আসত—কাজল শাহনেওয়াজ, সরকার মাসুদ আসত। শামসেত তাবরেজী, আদিত্য কবীর আসত। মাঝখানে আকরাম খান আসত, আকরাম খেত না কিন্তু আড্ডা দিত। তারপর ওর বউ আসত ডাক্তার রিতা—এখন যাকে বিয়ে করেছে, আগে প্রেম ছিল। জাহিদুর রহমান অঞ্জন আসত, তারপর ত্রিদিব দস্তিদার, আলিম আজাদ, শাহজাদ বুলবুল। আরও অনেকেই আসত এখন মনে পড়ছে না।
মুক্তিযুদ্ধে মোস্তফা আনোয়ারের অবদান নিয়ে কী যেন বলছিলেন...
রিফাত চৌধুরী : মোস্তফা আনোয়ার ভাইকে মাতাল অবস্থায় বহুদিন তার বাসায় পৌঁছে দিয়েছি। একদিন তাকে বাসায় পৌঁছে দিতে গিয়ে তার স্ত্রী অভিনেত্রী নাজমা আনোয়ারের সামনে পড়ে গেলাম। তিনি ভর্ৎসনা করলেন, বাবার বয়সী লোকের সাথে আমি মদ খাই। পরে যখন জানলেন, প্রায় প্রতিদিনই তাকে আমি নিরাপদে পৌঁছে দিয়ে যাই তখন আর কি বুঝলেন। যাই হোক, লেখালেখি তো করতেনই। উনি রেডিওতে চাকরি করতেন। মুক্তিযুদ্ধে উনার অনেক অবদান আছে। কালুরঘাট ব্রিজের ওখানে যখন তার প্রথম পোস্টিং হয়, ট্রান্সমিটার যন্ত্রটা কাঁধে করে নিয়ে গেছে—যেখান থেকে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা হয়। বিদেশে থাকলে এদেরকে নিয়ে ডকুমেন্টারি হতো, এদেশে কোনো মূল্যায়ন হলো না।
ছাঁটকাগজের মলাট নামে আপনি একটি লিটল ম্যাগাজিন করতেন, সেখানে আপনি কাদের লেখা ছাপতেন? আপনাদের কাগজের কোনো ইশতেহার ছিল কি?
রিফাত চৌধুরী : আমার নিজের লেখা ছাপতাম। কাজল শাহনেওয়াজের লেখা, মোস্তফা আনোয়ারের, আকরাম খানের লেখা ছাপা হতো। মাঝেমাঝে আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখাও ছাপা হতো। তারপর চয়ন খায়রুল হাবিবের লেখা ছাপা হতো। লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রই এটা, যে একটা কোনো লিটল ম্যাগাজিনে লিখবে সে অন্য কোনো কাগজে লিখতে পারবে না। একটা অলিখিত ইশতেহার ছিল যে, এই পত্রিকায় লেখা ছাপা হলে অন্য কোনো পত্রিকায় লেখা ছাপানো যাবে না। এই শর্তে রাজি হয়েই কাউকে লিখতে হতো। আমরা চারজন ছিলাম, আমাদের চারজনের ছিল আবার চারটা ছদ্মনাম। এই আটজনের লেখাই প্রকাশ করা হতো। আমার ছদ্মনাম ছিল জুঁইফুল চৌধুরী। এ ছাড়া আমরা বাইরের লেখা তেমন নিতাম না কারণ তখন মনে হয়েছিল যে, লিটলম্যাগ ব্যাপারটার মধ্যে একটা গোষ্ঠীবদ্ধতা আছে বা থাকতে হয়। সাহিত্য পত্রিকার চরিত্র ভিন্ন, সেখানে সবাইকে জায়গা দেওয়া হয়। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন মানেই সবাইকে জায়গা দেওয়া হবে না-রই ঘোষণা।
সে সময়ের প্রভাবশালী লিটল ম্যাগাজিন গাণ্ডীবের একটা ঘোষিত ইশতেহার ছিল... গোষ্ঠীবদ্ধতাও ছিল—সাজ্জাদ শরিফ, শোয়েব শাদাব, শান্তনু চৌধুরী...
রিফাত চৌধুরী : গাণ্ডীব কিন্তু একটা সাহিত্য পত্রিকা ছিল, এটা লিটল ম্যাগাজিন ছিল না। কারণ গাণ্ডীবের লেখকরা অন্যান্য পত্রিকায়ও লিখতেন।
সে সময় আরও যারা ছিল, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মাসুদ খান বা খন্দকার আশরাফ হোসেন—তাদের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক কেমন ছিল।
রিফাত চৌধুরী : সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। যাদের নামই আপনি নিলেন তাদের সবার সঙ্গেই অন্তরঙ্গ যোগাযোগ ও বিনিময় সবই ছিল। তবে গাণ্ডীব বা খন্দকার আশরাফ হোসেনের একবিংশ লিটল ম্যাগাজিন ছিল না।
ছাঁটকাগজের মলাটের কয়টি সংখ্যা বেরিয়েছিল?
রিফাত চৌধুরী : সম্ভবত ১২টি সংখ্যা বেরিয়েছিল। মূলত ’৮৪ সালে কাজল শাহনেওয়াজের সঙ্গে আমার একটি যুগল কবিতার বই বেরোয়। আমার অংশের নাম ছিল—আলিঙ্গনের নাম আর কাজলের অংশের নাম ছিল—জলমগ্ন পাঠশালা। দুটো বইয়ের সম্মিলিত নাম হিসেবেই ‘ছাঁটকাগজের মলাট’ নামের আবির্ভাব। পরে সম্মিলিত নামটি লিটল ম্যাগাজিনের নাম হয়ে যায়।
আপনার প্রথম একক বই বের হলো কবে?
রিফাত চৌধুরী : সেটা ’৯০ সালের দিকে। মেঘের প্রতিভা।
ওই সময়ে কেউ কেউ আপনার কবিতা নিয়ে অনেক উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন যেমন আবদুল মান্নান সৈয়দ...
রিফাত চৌধুরী : জি। এ ছাড়াও আরও কেউ কেউ করেছিলেন যেমন—আবিদ আজাদ, মোস্তফা আনোয়ার, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বেলাল চৌধুরী।
আশির দশক নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী।
রিফাত চৌধুরী : আশির দশকের হয়েছে কী... মানে সত্তরের পরবর্তী দশক তো, সত্তর দশকের যদি সে রকম উল্লেখযোগ্য কোনো মৌলিক কবি থাকে, থাকতে তো হবেই; আমি মনে করি সেই মৌলিক কবির প্রভাব আশির দশকের ভায়া হয়ে আসবে। আমরা মনে করতাম সত্তর দশকের তেমন মৌলিক কবি আবিদ আজাদকে। কিন্তু পরে দেখা গেল, আবিদ আজাদকে একটু কর্নারই করে দেওয়া হয়েছে। কেন করা হয়েছে—কারণ সে পলিটিক্যাল পার্টি করে না, সংগঠন করে না। ও শুধু প্রেস বিজনেস করে, কবিতা লেখে আর প্রচুর পান খায়, আড্ডা দেয়। আমরা দেখলাম এই জায়গাটায় হুট করে চলে এলো রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এটার কারণটা হলো পলিটিক্যাল কারণ। পলিটিক্যাল একটা অবস্থান থাকলে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়, পাবলিসিটি পাওয়া যায়। আরেকটা কথা আমি আপনাকে আজকে বলে দিই—বাংলা একাডেমি তো অনেককেই পুরস্কার দেয় আপনি জানেন। তারা কিন্তু কখনোই আবিদ আজাদকে কোনো পুরস্কার দেয়নি। তার অনুজ কবি বা যারা তার সমসাময়িক, কিন্তু আমি মনে করি না তারা কেউ তার মতো গভীর ও মৌলিক কবিতা লিখতে পেরেছে, তারা সবাই কিন্তু পেয়ে গেছে।
আপনি অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নিলেন কবে ও কীভাবে?
রিফাত চৌধুরী : অভিনয়ে গেলাম কারণ বাঁচার কোনো রাস্তা পাচ্ছিলাম না। লেখালেখি করে কোনো টাকাপয়সা পাওয়া যায় না, জানেন। ভিন্ন কোনো জায়গায় যে কাজ করব সেই অভিজ্ঞতাও আমার নেই। তখন নুরুল আলম আতিকের পরামর্শে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, তাহলে অভিনয়টাই করি। আতিক আমার ওপর একটা ডকুমেন্টারি করেছিল—একজন কবির সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কীভাবে কাটে, তার ওপরে। সেখানে প্রথম অভিনয় করি। তারপর আমাকে কাজের অফার দিল মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর একটা টেলিফিল্মে—নাম ছিল ‘কানামাছি’। তারপর আকরাম খানের একটা নাটকে কাজ করলাম। এভাবেই জড়িয়ে যাই।
একটা পারসেপশন আছে, ছবিয়াল গোষ্ঠী ব্যর্থ মানুষ হিসেবে কবিদের পোর্ট্রে করতে গিয়ে সেই কাজে আপনাকে ব্যবহার করেছে।
রিফাত চৌধুরী : কবিরা তো পরাজিত হয় এবং ব্যর্থ মানুষই হয় এটা তো ঠিকই! মৌলিক কবি কখনোই বৈষয়িকভাবে সফল হতে পারে না, জয়ী হতে পারে না। যার ফলে ওইদিক থেকে এটা পজিটিভ। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাই—ফারুকী একটা কাজ ভীষণ অন্যায় করেছে, ‘ব্যাচেলর’ নামে একটা ছবি সে করেছিল যেখানে শহীদ কাদরীর একটা কবিতার উদ্ধৃতি অত্যন্ত নোংরাভাবে করেছিল। এটাতে আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি এবং আমার মনে হয়েছে এমন একজন বড় কবির সঙ্গে এটা ঠিক হলো না। ‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সঙ্গে ঠিকই, কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না’—এটা হলো শহীদ কাদরীর কবিতা। ব্যাচলরে করেছে কী ফারুকী—মারজুক রাসেলকে দিয়ে আবৃত্তি করিয়েছে—‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সঙ্গে, বাচ্চা হবে না, বাচ্চা হবে না, বাচ্চা হবে না।’ এ ছাড়া মিডিয়াতে কবিদের ছোট করে দেখানোর জন্য ছবিয়ালকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। এই প্রবণতা আগে থেকেই ছিল।
অভিনয় শিল্পী হিসেবে একই সাথে অনেক জীবন যাপন করতে পারেন। পাশাপাশি কবি হিসেবে তো একটি ব্যক্তিজীবন চালিয়ে নিতে হয়, দুই জীবনের মিল-অমিল কী পেলেন?
রিফাত চৌধুরী : কোনো মিলই পাইনি। অভিনয়ের মাধ্যমে অনেক জীবন যাপন করতে পারা—সেটা তো চরিত্র অনুযায়ী। হয়তো একটা অফিসের পিয়ন বা ডাকাত সর্দারের চরিত্রে অভিনয় করলাম—যখন যেটা ধরিয়ে দেওয়া হলো। আর কবিতার জীবন তো আমার প্যাশনের জায়গা। যেখানে নিজেকে আমি মুগ্ধ করতে পারি। ফলে দুটা একেবারেই ভিন্ন দুই জায়গা। একই সঙ্গে আমি এ-ও মনে করি, কবিতা লেখা কোনো সুস্থ মানুষের কাজ না। চরিত্র স্টাবলিশ করার জায়গাও না। সামাজিক মানুষের কাজ হওয়া উচিত না কবিতা লেখা। কবিতা লিখতে আসবে যাদের সিজোফ্রেনিয়া আছে, যারা সংসারত্যাগী তারা।
কিন্তু আমরা তো বৈষয়িকভাবে সফল কবিদেরও দেখি।
রিফাত চৌধুরী : আমি এক জায়গায় লিখেছিলাম, কবিতা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিস। এই অপ্রয়োজনীয় জিনিসটাকে তারা এত প্রয়োজনীয় করে তুলল কেন। কেন এদের কবিতাটা দরকার পড়েছিল, এখন তো ধরেন টপ টু বটম সবাই কবিতা লিখতে চায়, কবি হতে চায়। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে এগুলা আসলে ঠিক কবিতার জন্য না। সমাজে একজন সুরুচির মানুষ হিসেবে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। গৌন কবি, কিন্তু দেখবেন ঘর বাড়ি সব করে ফেলেছে। আমি এটাকে বলি—ছোট কবির বড় বাড়ি।
অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয়তা কি আপনার কবিতার পাঠক বাড়িয়েছে?
রিফাত চৌধুরী : না না একদমই না, মোটেও তা বাড়ায়নি। কারণ আমার পাঠক হলো নির্বাচিত পাঠক। আমি আসলে পাঠকদের জন্য কবিতা লিখি না, যারা কবিতা লেখেন তাদের জন্য কবিতা লিখি। এক কথায় বলা যায়—কবিদের জন্য কবিতা লিখি।
আর্ট ফর আর্টশেক, অনেকটা এ রকম কি?
রিফাত চৌধুরী : না, এ রকম না, মানে আমার কবিতা কবিরাই পড়বে। আর সাধারণ মানুষের জন্য তো কবিতা নয়, আমি মনে করি।
কবিতা লেখার জন্য ছন্দ কতটা দরকার বলে মনে করেন।
রিফাত চৌধুরী : আমি তো মনে করি বাংলা কবিতায় যতগুলো ছন্দ স্টাবলিশ হয়েছে একাডেমিক্যালি, ওই সব ছন্দগুলোর সবই হলো সাধু ছন্দ। কিন্তু সাধু ভাষায় তো আমরা এখন আর লিখি না। এখন মানুষের কথ্য ভাষাতেই আমরা লিখি। কথ্য ভাষায় লিখে তো সাধু ছন্দ আমরা চালিয়ে নিতে পারব না। আমি তো মনে করি ছন্দ প্রাচীন যুগের জিনিস, ছন্দ কখন ছিল—ছন্দ আমাদের কিশোরগঞ্জের মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর সময়ের জিনিস। ছন্দটা ভেঙে আসলে স্টাবলিশ হয়েছে চিত্রকল্প। ছন্দটা যখন একেবারে ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেছে তখন চিত্রকল্পের জন্ম হয়ে গেল। এ সময়ে আমরা চিত্রকল্পের দিকে ধাবিত হচ্ছি; যার ফলে আমি আসলে ছন্দে একটি কবিতাও লিখিনি, আমার অনেকগুলো বই বেরিয়ে গেছে।
আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবিদ আজাদসহ সেই সময়ের প্রতিষ্ঠিত প্রায় সবার সঙ্গেই তো আপনার পরিচয় ছিল। আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমানের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?
রিফাত চৌধুরী : আল মাহমুদের সঙ্গে খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। তার সঙ্গে আমরা সিলেটে গেলাম, তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। ওখানে কবিতা পাঠ করার আগে আল মাহমুদ বললেন, ঢাকা থেকে দুজন আধুনিক কবিকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি—একজন রিফাত চৌধুরী আরেকজন কাজল শাহনেওয়াজ। শামসুর রাহমানের বাসায়ও প্রচুর যেতাম, গেলেই চা আর টোস্ট খেতে দিতেন।
শহীদ কাদরীর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?
রিফাত চৌধুরী : খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। আমার কবিতা পছন্দ করতেন। আমাকে তার কাছে নিয়ে গিয়েছিল আবিদ আজাদ। বলে রাখি, আবিদ আজাদের কবিতা শহীদ কাদরী অনেক উঁচুদরের মনে করতেন।
শাহবাগ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চারুকলাকেন্দ্রিক আড্ডাটা শুরু হলো কিভাবে, আড্ডার বিষয় কী ছিল আপনাদের?
রিফাত চৌধুরী : এই আড্ডাটা শুরু হয়ে গেল ১৯৯৫ থেকে। আজিজ সুপার মার্কেটটা যখন কমপ্লিট হয়ে গেল। কিছু কিছু বইয়ের দোকান স্টলে আসলো। আমাদের সাথে তো বইয়ের সাথে একটা সম্পর্ক আছেই। শুধু কবিতা নিয়েই যে আড্ডা হতো তা না। বিজ্ঞান, দর্শন, চিত্রকলা—আরও বহু জিনিস নিয়ে আমরা আড্ডা দিতাম। একমাত্র ধর্ম এবং রাজনীতিকে আমরা বাদ দিতাম।
কবিদের জন্য আড্ডা খুব দরকারি জিনিস?
রিফাত চৌধুরী : অসম্ভব দরকারি। আড্ডা খুব ক্রিয়েটিভ জিনিস।
শেষ প্রশ্ন, সকল মানুষের জন্য—খেটে খাওয়া মানুষের জন্য, অধ্যাপকদের জন্য, লেখকদের জন্য, যে কোনো স্তরের সাধারণ মানুষের জন্য আপনি কেমন রাষ্ট্র চান?
রিফাত চৌধুরী : আমি মনে করি প্রত্যেকটা মানুষই খুব মূল্যবান। তাদের জন্য আমি যে রাষ্ট্রটা চাই সেটা আসলে সমাজতন্ত্রের সঙ্গেই যায়। অন্তত এক শ বছর যদি এই দেশে সমাজতন্ত্র চলে তাহলে এটা একটা প্রয়োজনীয় প্র্যাকটিস হবে। এই প্র্যাকটিসের পরে আমরা তখন হয়তো গণতন্ত্রের দিকে যাব। আসলে আমি মনে করি গণতন্ত্র তো কোথাও নেই, তবু গণতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্রের বড় ভাই একজন আছে—সে হলো গণচৈতন্য। গণচৈতন্যটা যদি আমাদের সজাগ না থাকে তাহলে এই গণতন্ত্র দিয়ে আমাদের কাজ হবে না।