দেশের অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া অংশ এখন যাত্রী ও পথচারীদের জন্য আতঙ্ক। এই মহাসড়কের মাত্র ১৩ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে গড়ে উঠেছে পাঁচটি অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্ন, যা একেকটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। মহাসড়কের মাঝখানের সরু বিভাজন (ডিভাইডার) কেটে তৈরি করা এসব ইউটার্নের কারণে চলতি বছরেই অন্তত ৫০টি ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন এবং পঙ্গুত্ব বরণসহ আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। মেঘনা ব্রিজের পূর্ব প্রান্তের তেতৈতলা হাঁস পয়েন্ট, আনারপুরা, ভবেরচর ঈদগাহ সংলগ্ন এলাকা, বাউশিয়া মানাবে ওয়াটার পার্ক এবং বাউশিয়া পাখির মোড় এলাকায় এই ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্নগুলো রয়েছে। যথাযথ ট্রাফিক নিয়ম না মেনে গাড়ি ঘোরানো, হাইওয়ে পুলিশের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, কোনো প্রকার সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড না থাকা এবং মহাসড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় সরু ডিভাইডার কেটে ইউটার্ন তৈরি করাই এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিন দেখা যায়, গজারিয়ার ১৩ কিলোমিটার অংশের প্রতিটি ইউটার্নই তৈরি করা হয়েছে মহাসড়কের মধ্যবর্তী সরু বিভাজন কেটে। মেঘনা সেতুর পূর্ব প্রান্ত এবং মেঘনা-গোমতী সেতুর পশ্চিম প্রান্তে শুধু কংক্রিটের রোড ব্যারিয়ার দিয়ে সড়ক বিভাজন করায় চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেখানে কোনো গাড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করলেই পেছন থেকে দ্রুতগামী যান এসে সজোরে ধাক্কা দিচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে সংঘর্ষ, সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। এসব ইউটার্ন দিয়ে অবাধে চলছে থ্রি-হুইলার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, প্রাইভেট কার এবং স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ট্রাক ও লরি। পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন। এর ওপর মহাসড়কজুড়ে অবাধে পার্কিং করে রাখা হয়েছে শত শত ট্রাক। বাউশিয়া পাখির মোড় এলাকায় ওভারব্রিজ থাকায় দুর্ঘটনা তুলনামূলক কম হলেও, অন্যান্য প্রতিটি ইউটার্ন যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদ; যেখানে নিয়মিত প্রাণহানি ঘটছে।
ইউটার্নগুলোতে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর আনারপুরা ইউটার্নে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় চালক বিল্লাল হোসেন (৩৮) মারা যান। এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর তেতৈতলা হাঁস পয়েন্ট ইউটার্নে বাস ও প্রাইভেট কারের সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হন। এছাড়া ১৮ আগস্ট ভবেরচর ইউটার্নে বাইক চালক আবুল কালাম, ১৭ আগস্ট আনারপুরা ইউটার্নে বাসের ধাক্কায় অটোরিকশার ২ যাত্রী এবং ২২ আগস্ট তেতৈতলা হাঁস পয়েন্টে তোতা মিয়া নামে এক পথচারী প্রাণ হারান। গত ৯ জুন বালুয়াকান্দিতে ২ নারী পথচারী, ১৫ জুন মানাবে ওয়াটার পার্ক ইউটার্নে হাবিবুল্লাহ, ১৮ মে তেতৈতলা হাঁস পয়েন্টে একজন, ২৫ মে মানাবে ওয়াটার পার্কের সামনে লরি হেলপার অন্তর দাস, ৩০ মে একই স্থানে অজ্ঞাত এক নারী এবং ৮ মে আনারপুরা ইউটার্নে সজিব নামের এক যুবকসহ আরও অনেকেই এই স্পটগুলোতে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মহাসড়কের রোড ডিভাইডারের নকশাগত ত্রুটিই দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। পাশাপাশি নজরদারির অভাব এবং হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বে শিথিলতার কারণে এই ইউটার্নগুলো দিয়ে থ্রি-হুইলার, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অবাধে চলাচল করছে। সড়কের পাশে অবৈধ ট্রাক পার্কিং এবং নিয়ম ভেঙে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোও নিত্যদিনের এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
এ বিষয়ে ভবেরচর হাইওয়ে পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান জানান, মহাসড়কের নিরাপত্তায় তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন। নিষিদ্ধ যানবাহন বন্ধে চালকদের সচেতন ও নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও গাড়ি জব্দ করা হচ্ছে। এমনকি সচেতনতা বাড়াতে চালকদের নিয়ে সভাও করা হচ্ছে। এরপরও শতভাগ সাফল্য না আসার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ইউটার্নগুলোতে যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে, তাতে এই স্থানগুলো দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আলরাজী লিয়ন বলেন, গজারিয়া অংশের ইউটার্নগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, ইতিমধ্যে বাউশিয়া মানাবে ওয়াটার পার্কের সামনের ইউটার্নে সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য মাটি ভরাটের কাজ চলছে এটা শেষ হলে ১/২টি ইউটার্ন বন্ধ করে দেওয়া হবে।
বিষয়টি নিয়ে হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর রিজিয়নের অতি.পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, মহাসড়ক নিরাপদ রাখতে আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি, আমাদের চেষ্টায় কোনো কার্পণ্য নেই আর নির্মাণে ত্রুটি রয়েছে কি না তা বলতে পারবেন বিশেষজ্ঞরা।
সার্বিক বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের জন্য কাজ করছি তখন এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়ে যাবে। তবে এই মুহূর্তে আমরা মানাবে ওয়াটার পার্কের সামনে ইউটার্ন প্রশস্তকরণের কাজ শুরু করেছি, মেঘনা ব্রিজের নিচ দিয়ে একটা ইউটার্ন নির্মাণের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, অচিরেই টেন্ডার সম্পূর্ণ হবে বলে আশা করছি, তখন ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্নগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।