স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, যেভাবে নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবে আমরা বাস্তবায়ন করব। কেউ এখন যদি দাবি করে যে, নোট অব ডিসেন্ট বেঁধে রেখে বাস্তবায়নের জন্য সে জায়গায় আমরা নেই। ঐকমত্য সেখানে হয়নি। জুলাই সনদ ছাড়াও আরও অনেক বিষয় আছে এখানে সংশোধনের মধ্যে আনতে হবে। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে আছে বিভিন্ন জনতার মধ্যে আছে। সেগুলো আমরা ধারণ করে একটা বিল পার্লামেন্টে উপস্থাপনের জন্য রিপোর্টটা প্রদান করব। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্যই তো আমরা এই সংবিধান সংশোধন কমিটিতে সবার বক্তব্য শুনছি।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটের ব্যবস্থা রাখা হবে। একই সঙ্গে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হলে ভবিষ্যতে তা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও জনগণের কাছে যেতে হবে এমন বিধান থাকবে বলে জানিয়েছে সংবিধান সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও দায়মুক্তি দাবি করেছেন শহীদ পরিবার ও আহতরা। এ বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করেছে কমিটি।
বৈঠকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য ও আহতদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়। শহীদের মা-বাবা, ভাইসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে মোট ৬৩ জন এতে অংশ নেন। তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চেয়েছেন। বিশেষ করে জুলাই ঘোষণাপত্রের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যেন আমরা সংবিধানের উপযুক্ত জায়গায় ধারণ করি। আমরা বলেছি, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নকালে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল এবং শক্তি যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, সেভাবে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আপনাদের প্রস্তাবও আজকে লিপিবদ্ধ করব। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষার জন্য আইন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করা হবে।
শেখ হাসিনাসহ দায়ীদের দ্রুত বিচার দাবি : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পক্ষ থেকে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার দাবিও এসেছে বলে জানান কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষেরই দাবি। শেখ হাসিনাসহ তার দোসর যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা এবং জঘন্য হত্যাকা- চালিয়েছে, তাদের বিচার যেন ত্বরান্বিত করা হয়। এটা করতে সরকারও আন্তরিক।
সংবিধান সংশোধনে গণভোটের বিধান : গণভোটের প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘গণভোট হয়েছে এটা আমরা বৈধ গণভোট বলছি। আইনি গণভোট। কিন্তু গণভোটের অধ্যাদেশ যেটা, সেটাকে আমরা আইনি দিতে পারিনি। কারণ সেখানে অনেক সমস্যা ছিল। আর সেই বক্তব্য আমরা পার্লামেন্টে দিয়েছি।’ তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে যেসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তন বা সংযোজন আসবে, সেগুলো কার্যকরের আগে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটা হচ্ছে সাংবিধানিক গণভোট। আগে যে গণভোট হয়েছে সেটা আইনি গণভোট। এই সাংবিধানিক গণভোটটা আমাদের বাধ্যবাধকতা। সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক বিষয়গুলোতে পরিবর্তন এলে গণভোটের বিষয়টি আসবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আর্টিকেল ৪৫৬-এ আসবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আমরা ধারণ করব।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরিয়ে আনা হলে ভবিষ্যতে কেউ যাতে সহজে তা পরিবর্তন করতে না পারে, সে বিষয়েও গণভোটের বিধান রাখা হবে।
১৪২ অনুচ্ছেদ ও গণভোটের বিধান : সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান তুলে দেওয়ার বৈধতা নিয়ে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘সংবিধানে তো গণভোট নেই, আমরা কেন গণভোটের কথা বলছি অনেকে বলছেন। ১৪২ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে গণভোটের বিধান তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং সেটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় হয়েছে। অর্থাৎ আগে যা ছিল তাই সঠিক। কিন্তু অনেকে বলছেন, সেটা তো অটোমেটিক বহাল হয় না। এখানে আমার বক্তব্য হচ্ছে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। একটা ডকট্রিন আছে। এটা হচ্ছে ডকট্রিন অব ইক্লিপস। আইনের ‘গ্রহণ’ বা ইক্লিপসের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রহণটা সরে গেলে চাঁদ আবার দেখা যায়। এটাকে বলা হয় ডকট্রিন অব ইক্লিপস।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধানের যে বিধানটা পরিবর্তন করে বাতিল করে দিয়েছিল, সেটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। সুতরাং হাইকোর্টে বলা হয়েছে। এখানে একটা আইনের জটিল প্রশ্ন আছে। সেটা যতদিন পার্লামেন্টে আবার সংবিধান ধারণ না করবে, ততদিন পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলা যাবে না। তবে বিচার বিভাগ তাদের যে রায় দিয়েছে, সেই রায় অনুসারে সংবিধানে আমরা এই সংশোধন ধারণ করব। সুতরাং এটা অসাংবিধানিক যদি কেউ বলে, এখন তো সংবিধানে গণভোটের বিধান নেই। গণভোটের বিধান হয়েছে। আমরা এটা যখন সংবিধানে নিয়ে আসব, তখন সেটা আমাদের মানতে হবে। সেই হিসাবে আমরা সংবিধানে ভোটটা দিই।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরবে, পদ্ধতি এখনো চূড়ান্ত নয় : তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী প্রক্রিয়ায় গঠিত হবে, কারা থাকবেন এবং কোন পদ্ধতিতে তা গঠিত হবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এ পদ্ধতিটা পার্লামেন্টে আলোচনার মধ্য দিয়েই আসবে। এখন সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাবকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাখার বিষয়ে কমিটির অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতিকে কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারে প্রধান করার প্রস্তাবটা আমরা গ্রহণ করিনি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও প্রস্তাব আসতে পারে এবং আমরা যাদের সঙ্গে আলাপ করছি, তাদের পক্ষ থেকেও প্রস্তাব আসতে পারে। এগুলো থেকে এমন একটা তত্ত্বাবধায়ক সংজ্ঞা পদ্ধতি ধারণ করতে চাই, যেটা বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবে।’
লংমার্চ বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার : বিরোধী দলের লংমার্চের কর্মসূচি প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘লংমার্চ কেন করছে সেই প্রশ্নের উত্তর তারা দেবে। আর লংমার্চ যারা করছে, সেটা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। লংমার্চ করুক আর যাই করুক, সংবিধান সংশোধন তো জাতীয় সংসদে হবে।’