মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের ভোগান্তি

সরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান সেবা চালু হওয়ার পর দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসাব্যয় কমার কথা। তবে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর একটি অংশ বাইরে থেকে কেনার কারণে উল্টো অতিরিক্ত খরচের বোঝা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রোগীর স্বজনদের।

এমন চিত্র হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। স্থানীয়রা জানিয়েছেন এখানে সিজারিয়ান অপারেশন করাতে রোগীর স্বজনদের গুনতে হচ্ছে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৫ জুলাই মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে  সিজারিয়ান অপারেশন চালু হয়। ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত এখানে ২০০টি সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরের কিছু বেশি সময়ে ২০০ প্রসূতির সিজারিয়ান হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের এই সেবা প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হওয়ার কথা থাকলেও অপারেশনের সময় বিভিন্ন ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস বাইরে থেকে কিনতে গিয়ে অনেক পরিবারকে কয়েক হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য কেন রোগীর স্বজনদের এত টাকা খরচ করতে হচ্ছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ইমরুল হাসান বলেন, ওটি চার্জ ২ হাজার টাকা এবং প্রতিদিনের কেবিন ভাড়া ২০০ টাকা। এ ছাড়া কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। তবে সরকারিভাবে কিছু ওষুধপত্রও দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

তবে হাসপাতালের অপর একটি সূত্রের দাবি, সব মিলিয়ে একটি সিজারিয়ান অপারেশনে রোগীর পরিবারের ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সামগ্রীর ওপর নির্ভর করে খরচ আরও বাড়তে পারে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে—সরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান সেবার জন্য নির্ধারিত খরচ কত এবং কোন কোন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে দেওয়ার কথা, আর কোনগুলো রোগীকে কিনতে হবে?

একটি সিজারিয়ান অপারেশনের আগে সাধারণত প্রসূতির প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও অপারেশনের প্রস্তুতি নিতে হয়। অপারেশনের সময় অ্যানেসথেশিয়া, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, জীবাণুমুক্ত সামগ্রী, শিরায় দেওয়ার তরল, প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ, সেলাইয়ের উপকরণ এবং নবজাতকের প্রাথমিক পরিচর্যার সামগ্রী প্রয়োজন হতে পারে।

অপারেশনের পর প্রসূতির ক্ষেত্রে ব্যথানাশক, প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক, শিরায় তরল, ক্ষত পরিচর্যার সামগ্রীসহ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অন্যান্য ওষুধ লাগতে পারে। নবজাতকের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের মূল্যায়ন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও ওষুধ লাগতে পারে।

তবে এসবের কোনটি হাসপাতাল সরবরাহ করবে এবং কোনটি রোগীর স্বজনকে কিনতে হবে—তার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম না থাকায় প্রয়োজনের সময় চিকিৎসক নার্সদের কথামতো অনেক ওষুধ বাইরে থেকে এনে দিতে হয়। 

মাধবপুরে সিজারিয়ান সেবা চালুর মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি ছিল স্থানীয় প্রসূতিদের কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু অপারেশন ফি, কেবিন ভাড়া এবং বাইরে থেকে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনার খরচ মিলিয়ে যদি একটি পরিবারকে ৪–৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি ব্যয় করতে হয়, তাহলে দরিদ্র পরিবারের ওপর এর প্রভাব কী—সেই প্রশ্ন উঠছে।

বিশেষ করে গ্রামের নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর অনেকের কাছেই একসঙ্গে কয়েক হাজার টাকা জোগাড় করা কঠিন। ফলে সরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান সেবা থাকা সত্ত্বেও তাদের কেউ কেউ ধারদেনা করে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি কমাতে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য সরকারি বরাদ্দে হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় সব ওষুধ ও সামগ্রী সরবরাহের দাবী জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। একই সঙ্গে পরিকল্পিত সিজারিয়ানের জন্য নাম নিবন্ধনের নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, অপারেশনের আগে কী কী পরীক্ষা করতে হয়, কত টাকা সরকারি ফি, কেবিন ভাড়া কত এবং অপারেশনের পর কতদিন পর্যন্ত ফলোআপ দেওয়া হয়—এসব তথ্যও রোগীদের সহজে জানার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সিটিজেন চার্টারে এসব তথ্য যথাযথভাবে থাকলে উপকারভোগীদের সুবিধা হয় বলেও মনে করেন তারা। 

কারণ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে একজন দরিদ্র প্রসূতির পরিবারকে যেন অপারেশন থিয়েটারের দরজায় গিয়ে জানতে না হয়—কোন ওষুধ হাসপাতাল দেবে, আর কোনটি কিনতে হবে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ঘোষিত লক্ষ্যই হলো সবার জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইমরুল হাসান বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা চেষ্টা করি কিভাবে সেবাটা এনশিউর করা যায়।