ফলন-দাম ভালো, হিলিতে বাড়ছে কাঁচামরিচের চাষ

ফলন ও দাম ভালো পাওয়ার কারণে লাভজনক হওয়ায় দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে দিন দিন বাড়ছে কাঁচামরিচের চাষাবাদ। অন্য ফসলের তুলনায়
খরচ কম, পরিচর্যা তেমন না লাগায় কাঁচামরিচ চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার মরিচের ভালো ফলন যেমন হয়েছে তেমনি দাম ভালো পাওয়ায় বাড়তি লাভের আশা চাষিদের। এদিকে কাঁচামরিচ চাষে সবধরনের সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

শষ্যভান্ডারখ্যাত দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী হিলির বিভিন্ন মাঠে এখন বাণিজ্যিকভাবে কাঁচামরিচের চাষ হচ্ছে তবে এমন চিত্র আগে ছিলনা। হিলির আলিহাট ইউনিয়নের মুর্শিদপুর গ্রামের কৃষক আতিয়ার রহমান বগুড়ায় মরিচ চাষ দেখে আগ্রহী হয়ে উঠেন। সেখান থেকে পরামর্শ ও বীজ নিয়ে এলাকায় মরিচ চাষ শুরু করেন। লাভজনক হওয়ায় তার দেখাদেখি এলাকার অনেক কৃষক কাঁচামরিচ আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

হিলির মুর্শিদপুর গ্রামের কৃষক আতিয়ার রহমান বলেন, বিগত বেশ কিছুদিন ধরে ধান আবাদ করি কিন্তু তেমন লাভজনক হয় না। এমনকি ধান আবাদ করতে যে খরচ হয় সেই খরচের টাকাই ওঠে না। অপরদিকে কাঁচামরিচ আবাদ করলে খরচের চেয়ে দ্বিগুণের বেশী লাভ আছে। এটা আমাদের এলাকার মানুষ বোঝে না তাই তারা লাগায় না। কিন্তু বগুড়ার কাহালু এলাকায় গিয়েছিলাম বেড়াতে সেখানে দেখি সব কৃষক কাঁচামরিচ চাষ করে। কোন কৃষক ধান আবাদ করেনা আবার মরিচ চাষ বেশ লাভজনক। আমি ওখানে মরিচ চাষ দেখার পরে আমার আগ্রহ জাগে মরিচ চাষে। আমি ওখান থেকে কাঁচামরিচের বীজ সার সংগ্রহ করে নিয়ে আসি। বাড়ি ফিরে এসে সেখানকার কৃষক ও স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ মোতাবেক কাঁচামরিচ চাষ শুরু করছি। প্রথমে অল্প পরিমাণে লাগিয়ে যেমন ফলন পেয়েছি তেমনি দাম ভালো পাওয়ায় কাঁচামরিচ চাষ করে বেশ লাভবান হয়েছি। যেখানে ধারাবাহিকভাবে ধান আবাদ করে শুধু লোকসান গুনতে হয়েছিল। এর পর আবারো সেখান থেকে বীজ থেকে শুরু করে ওষুধপত্র যা লাগে সব ওখান থেকেই নিয়ে আসি। শুধু সারটা আমি এখান থেকে কিনে এইবারে জমির পরিমাণ বাড়িয়ে ৩বিঘা জমিতে কাঁচামরিচ চাষাবাদ করছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাছ যেমন ভালো হয়েছে তেমনি প্রচুর পরিমাণে কাঁচামরিচ ধরেছে। বর্তমানে কাঁচামরিচের দাম ১১০ থেকে ১২০টাকা এর মধ্যেই থাকে। এখন পর্যন্ত আমার খরচ হয়েছে ৭০হাজার টাকার মত। কিন্তু আমি এর মধ্যেই আড়াই লাখ টাকার কাঁচামরিচ বিক্রি করেছি। জমিতে এখনো যে পরিমাণ কাঁচামরিচ রয়েছে তাতে করে আরো আড়াইলাখ টাকা বিক্রি করতে পারবো। সরকার তো যখন বাহিরের দেশ থেকে কাঁচামরিচ ইমপোর্ট করে নিয়ে আসে। সেসময় একটু মরিচের দাম আবার কমে যায় সে ক্ষেত্রে লোকশানের আশংকা থাকে। আর সরকার যদি বাহির দেশ থেকে মরিচ না নিয়ে আসে, তাহলে মোটামুটি লাভ হবে। এদিকে আমার কাঁচামরিচের আবাদের দেখাদেখি আরো অনেকে এখন কাঁচামরিচ লাগাচ্ছে। তাদের কাঁচামরিচের গাছগুলো ভালো হইছে, ফলনও ভালো আছে। ধান আবাদ করে লাভ নাই সবজি আবাদেই লাভ বেশি। 

আগ্রহী কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমি আগে রিকশা ভ্যান চালাতাম আর কৃষি কাজ করতাম। তারপর আমার গ্রামের এক ছেলে কাঁচামরিচ আবাদ করতেছিল। ওর আবাদ করা দেখেছি ফলন যেমন হয়েছে তেমনি দাম ভালো হওয়ায় কাঁচামরিচ চাষ বেশলাভজনক হইছে। তার দেখাদেখি আমারো ইচ্ছা হলে কাঁচামরিচ চাষাবাদে। সেই মোসাতাবেক স্থানীয় একজনের নিকট থেকে আমি একটা জমি বর্গা নিয়ে সেখানে আমিও কাঁচামরিচ লাগাইছি। আবহাওয়া ভালো থাকায় ইনশাআল্লাহ আশা করি কাঁচামরিচের ভালো ফলন আসবে এবার। সেই সাথে দাম ভালো থাকায় কাঁচামরিচ চাষ করে লাভবান হতে পারবো বলে আমি আশাবাদী।

কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের গ্রামের কৃষক আতিয়ার রহমান বগুড়ার কাহালু থেকে কাঁচামরিচের বীজ নিয়ে আসছি। বীজ নিয়ে আসার পরে গত বছর প্রথমবার কাঁচারিচ লাগাইছে। সে বছর লাগানোর পরে মরিচের যেমন ভালো ফলন হয়েছে যার কারনে ভালো লাভবান হয়েছে। ধানে তো লস, এজন্য আমরা ধান না আবাদ করে এই মরিচ চাষ করে ভালো লাভ দেখা গেছে। সেই লাভের আশাতেই তো আমরা মরিচ চাষ করেছি।

এখন তো মোটামুটি কাঁচামরিচের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে, এই ১১০ থেকে ১২০টাকা বাজার যাচ্ছে ।

আগ্রহী কৃষক আফজাল হোসেন, ধানে আমরা কোনো লাভবান হতে পারছি না। তাই চিন্তা করছি সামনের বছর থেকে ধান আবাদ বাদ দিব। অল্প পরিমাণে হলেও জমিতে কাঁচামরিচ লাগাবো। সামনে বার থেকে কাঁচামরিচ আবাদ করে দেখি। আমার জমির পার্শ্ববর্তী জমিতে ঝাল আবাদ হচ্ছে। সামনে বার থেকে আল্লাহ যদি তাকায়, আতিয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আমরাও কাঁচামরিচ আবাদ করবো।

শ্রমিক তারিকুল ইসলাম বলেন, আগে তো আমাদের এলাকায় কাঁচামরিচ আবাদ হতনা, শুধু ধান আবাদ হতো সেই ধানের জমিতে ধান রোপণ থেকে শুরু ঘাস তোলা, আগাছা পরিষ্কার করা, সার দেওয়া কীটনাশক দেওয়া এসবের কাজ করতাম। এখন আতিয়ার ভাইসহ অন্য ভাইয়েরা কাঁচামরিচ আবাদের পর থেকে আমরা এখন সেই জমিতে কাজ করছি। কাঁচামরিচের গাছ বাধে দেই, ঘাস তুলি, ঝালের গাছের গোড়া বেন্দা দেই। এইসব কাজ করে যা মজুরি পাই তাই দিয়ে সংসার ভালোভাবেই চলে যায়। এভাবে যদি অন্যরা কাঁচামরিচ লাগায়, তাহলে আমাদের কাজ যেমন বাড়বে এতে করে আয় রোজগার বাড়বে। ফলে আমরা খাওয়াদাওয়া একটু ভালোভাবে করতে পারবো ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারবো।

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, ফলন ও দাম ভালো হওয়ায় কৃষকরা মরিচ চাষে আগ্রহী হচ্ছে। যার কারনে হাকিমপুর উপজেলায় দিন দিন মরিচের চাষাবাদ বাড়ছে। আগে যেখানে আমাদের উপজেলায় ২ থেকে ৩ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছিল এখন তা বেড়ে ৮ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। মানুষ শুধু এখন জমিতেই না ইদানিং তারা টবেও মরিচ চাষাবাদ করছে। আমাদের কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন এবং কৃষক ভাইদেরকে পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছি। কৃষক ভাইয়েরা আগামীতে মরিচ চাষে আরো বেশি অনুপ্রাণিত হবে। ফলে আগামীতে আরো বেশি পরিমাণে মরিচ চাষাবাদ হবে সেইসাথে আমাদের কৃষক ভাইয়েরা লাভবান হবে।