এডেন বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যকার লড়াই তীব্রতর হওয়ায় ইয়েমেনের এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুথিরা। দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় বুধবার এই হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বাব এল-মানদেব প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বের কারণে প্রণালিটি বিশ্বজ্বালানি রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথ হয়ে ওঠায় এর গুরুত্ব বহু গুণ বেড়ে গেছে।

চলতি সপ্তাহে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান সহায়তায় ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী এই প্রণালির নিকটবর্তী কৌশলগত এলাকা এবং মোখা শহরের চারপাশ পুনর্দখলে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে এলাকাগুলো হুথিরা দখল করে নিয়েছিল। তবে সরকারি বাহিনীর এই অগ্রযাত্রা কতটা টিকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের প্রভাবে ইয়েমেনের দীর্ঘ ১২ বছরের যুদ্ধ নতুন করে জোরালো রূপ নিয়েছে। এর ফলে এক সময়ের বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে পড়ে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাওয়া আরব বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র এই দেশটি আবারও বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বুধবার জানিয়েছে, সাম্প্রতিক লড়াই শুরুর পর থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

আইওএম-এর মহাপরিচালক অ্যামি পোপ খাদ্য ও আশ্রয়ের জরুরি সহায়তার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে, কিন্তু তাদের নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই।’ যুদ্ধের বিস্তারিত না জানিয়ে উভয় পক্ষই দাবি করেছে এতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ইয়েমেনের কিছু এলাকায় প্রতি চার পরিবারের মধ্যে তিনটি পরিবার এখন অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।

হুথি বিদ্রোহীরা দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন মিত্র সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার এবং পাইপলাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। বুধবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দাবি করেছে, তারা সৌদি রাজধানী রিয়াদের উত্তরে হুথিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে ধ্বংস করে দিয়েছে। জোটটি জানিয়েছে, হুথি নিয়ন্ত্রিত সানায় অবস্থানরত হামলাকারী উৎক্ষেপণ কেন্দ্রটিকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং তা ধ্বংস করা হবে। তবে এতে হতাহত বা ক্ষতির কোনো বিবরণ দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া স্যারি এক বিবৃতিতে দাবি করেন, তারা বেশ কয়েকটি ড্রোন দিয়ে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে সফল হামলা চালিয়েছেন। যদিও সৌদির পক্ষ থেকে এই বিমানবন্দর আক্রমণের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালির ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পেলে তা আন্তর্জাতিক সমুদ্র যোগাযোগ ও বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে। এ কারণে সৌদি আরব হুথিদের প্রতিহত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাইছে। ন্যাটো সদস্য তুরস্ক ও পাকিস্তান নতুন গঠিত জোটের অধীনে যৌথ প্রতিরক্ষা সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর, তুরস্ক প্রধানত আত্মরক্ষামূলক ও কারিগরি সহায়তা পাঠানো শুরু করেছে বলে দুই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।

ইয়েমেনি সামরিক ও সরকারি সূত্র জানিয়েছে, পশ্চিম ফ্রন্টের লড়াই মূলত বাব এল-মানদেব প্রণালির ওপর অবস্থিত ধুবাব এলাকায় কেন্দ্রীভূত রয়েছে। উপকূলীয় সমভূমির পূর্ব দিকের কৌশলগত পাহাড়ি এলাকায় অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে প্রো-সরকার বাহিনী। সেখানে তীব্র সংঘর্ষ চলছে এবং হুথিরা দাবি করেছে তারা সরকারি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করেছে।

গত সোমবারে ইয়েমেন সরকার দাবি করেছিল তারা মোখায় পৌঁছে গেছে, যা সংঘাতপূর্ণ তাইজ এলাকার রসদ সরবরাহ পথের সংযোগস্থলে অবস্থিত। তবে ইয়েমেনি সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সেই দাবিটি কিছুটা আগাম ছিল।

সানা সেন্টারের গবেষক হুসাম রদমান জানান, রক্ষণশীল সুন্নি সালাফি গোষ্ঠী 'জায়ান্টস ব্রিগেড'-সহ সরকার সমর্থিত বাহিনীগুলো ধুবাব এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে এবং এর পূর্বাঞ্চলীয় পর্বতমালায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। ওই পর্বতমালাগুলোর নিয়ন্ত্রণ পেলে সরকারি বাহিনীগুলোর জন্য বাকি উপকূলীয় অঞ্চলে এগিয়ে যাওয়া অনেক সহজ হবে। 

ইয়েমেনের পূর্ব উপকূলজুড়ে হামলার বিস্তার ঘটেছে। মিশর থেকে আসা একটি ফ্লাইট অবতরণের মাত্র কয়েক মিনিট আগে এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে সামান্য দূরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ বিমানটি নিরাপদে জেদ্দায় অবতরণের নির্দেশ দেয় এবং রানওয়েতে থাকা আরও দুটি বিমান সরিয়ে নেয়। এই বিমানবন্দরটি হুথি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অংশগুলোর জন্য প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার। তবে এই হামলার বিষয়ে হুথিদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

২০১৪ সালে উত্তর ইয়েমেনের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে নিলে, সীমান্তে চরম বিশৃঙ্খলা ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কায় ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়িত হওয়ায় বড় ধরনের লড়াই বন্ধ থাকলেও তা স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয়নি।

সৌদি জোট প্রতিনিয়ত অভিযোগ করে আসছে যে ইরান হুথিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। তবে পাহাড়ি এই যোদ্ধারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে শক্তিশালী হয়ে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হলেও ইরানের প্রক্সি হিসেবে কাজ করার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে, তারা নিজেরাই অস্ত্র তৈরি করে। তেহরানও এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

এর আগে বুধবার দিনের শুরুতে সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, সৌদির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত শহরের দিকে ধেয়ে আসা হুথিদের আরেকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করে সৌদি জোট।

তবে পৃথক বিবৃতিতে হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া স্যারি জানান, তারা আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সফল হামলা চালিয়েছে। অবশ্য আবহা বিমানবন্দরে হামলার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।