এ পৃথিবী একবার পায় তারে...

বিশ্বফুটবলের দীর্ঘতম আর রোমাঞ্চকর এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় যেন এটি। মঙ্গলবার রাতের আলো-আঁধারিতে বুয়েনস আয়ারসের এস্তাদও মনুমেন্তালে কোনো পয়েন্ট বা প্রতিযোগিতার হিসাব-নিকাশ ছিল না; পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে কেবলই ভাসছিল এক শতাব্দীর সেরা ফুটবল রাজপুত্রের আবেগঘন বিদায়লিপি। গ্যালারি থেকে ভেসে আসা ‘মেএএ-সি, মেএএ-সি’ ধ্বনি কোনো সাধারণ স্লোগান ছিল না, তা ছিল এক রাজকীয় আর্জি। শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ ভক্তরা চোখের জল সংবরণ করতে পারছিলেন না। কারণ ২১ বছর ধরে জাতীয় দলের আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে জড়ানো এই ভিনগ্রহের মানবকে ছাড়া আর্জেন্টিনার ফুটবল তারা কখনোই কল্পনা করেনি।

৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবলের জাদুকর যখন আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান, তখন পেছনে ফেলে আসেন এক অভাবনীয় অর্জনের পাহাড় একটি বিশ্বকাপ জয়, দু-দুটি ফাইনালে ওঠার গল্প, পরপর দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপা এবং অলিম্পিক সোনা থেকে শুরু করে যুব বিশ্বকাপের সোনালি স্মৃতি। বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে থাকা প্রতিটি ফুটবলভক্তের জন্য তিনি ছিলেন এমন এক ধ্রুবতারা, যার পারফরম্যান্সের মান তিনি এত উঁচুতে বেঁধে দিয়ে গেছেন যে, ভবিষ্যতে তা স্পর্শ করা তো দূরের কথা কল্পনা করাও দুষ্কর।

বেনিনের সঙ্গে ম্যাচ শুরুর আগে যখন আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত বাজছিল, মেসির গলায় কোনো সুর ছিল না, কান্না চেপে রাখতে গিয়ে গলায় দলা পাকিয়ে উঠেছিল এক বিশালাকার কান্না। সেই মুহূর্তটিতে হয়তো তার মনে পড়ছিল শৈশবের স্মৃতি, যখন ছোটবেলায় প্রথম কোচ সালভাদোরকে বলার পর দাদি সেলিয়া জোর করে তাকে মাঠে নামিয়েছিলেন ওকে খেলতে দাও, ও ম্যাচ জিতিয়ে দেবে। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল এক অন্তহীন যাত্রা। সেই প্রথম আলো জ্বালানো দাদি এবং বাবা হোর্হে মেসির স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করেই তিনি খেলে গেলেন দেশের হয়ে তার জীবনের শেষ খেলা।

ম্যাচের ফল যা-ই হোক, খেলার ৫২ মিনিটে নিকো ওতামেন্দিকে দিয়ে গোল করানো কিংবা পেনাল্টি থেকে আর্জেন্টিনা জার্সিতে নিজের ১২৬তম গোলটি করে সতীর্থদের সঙ্গে জন্মদিনের মতো আনন্দ উদযাপনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মেসির নিজস্ব শৈলীর মহাপ্রদর্শন। অথচ এই চূড়ায় পৌঁছানোর গল্পটা সহজ ছিল না। শৈশবে গ্রোথ হরমোনের ত্রুটি কাটাতে শরীরে প্রতিদিন নিজ হাতে ইনজেকশন নেওয়া, বার্সেলোনায় একা থাকার যন্ত্রণা আর মাতৃভূমির জন্য স্পেনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি অকৃত্রিম টান সব বাধা তিনি পায়ে ঠেলেছেন। এক দশক আগে যখন নির্মম সমালোচনা আর ট্রোলের শিকার হয়ে তিনি বলেছিলেন ‘জাতীয় দল আমার জন্য নয়’, সেখান থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। মারাকানা, ওয়েম্বলি আর দোহার লুসাইলে রূপকথার পর ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য জয় সবই ছিল তার অদম্য জেদের প্রমাণ।

তবে কেবল ট্রফি, গোল কিংবা রেকর্ডের পরিসংখ্যান দিয়ে লিওনেল মেসিকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি অনন্য হয়ে উঠেছেন তার নিরহংকার ও বিনয়ী ব্যক্তিত্বের জন্য। চরম তারকাখ্যাতি, সীমাহীন খ্যাতি আর চাপের মাঝেও তিনি ধরে রেখেছেন অসাধারণ শান্ত মেজাজ। কোনো অহংকার নেই, নেই আত্মপ্রচারের লোভ এই চারিত্রিক সততাই তাকে খেলাধুলার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের প্রতিটি কোণে কোটি কোটি শিশু ও তরুণের কাছে জীবনের এক অনুপ্রেরণাদায়ক আদর্শে পরিণত করেছে।

সাহিত্যিক থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে ক্রীড়া সাংবাদিক ও ফুটবল পণ্ডিতরা তার খেলা নিয়ে অজস্র বই লিখেছেন, জমা করেছেন শত শত বিশেষণ। কিন্তু বিশ্বফুটবলকে তিনি যেভাবে আনন্দিত করেছেন, তাকে কোনো শব্দবন্ধে বেঁধে রাখা যায় না। ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনায় রূপকথা শুরুর পর থেকে আর্জেন্টিনার হয়ে ২০২২ সালের বিশ্বজয়ের মঞ্চ পর্যন্ত মেসি বিশ্বকে বারবার সুখী করেছেন। তার পায়ের সেই জাদুকরী বাঁক, মন্ত্রমুগ্ধকর ড্রিবলিং আর নিখুঁত পাসিং আমাদের শিখিয়েছে খেলাটাকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়।

বিশ্বফুটবলের এই বিদায়ী মহাকাব্যের মাঝে আমরা বাংলাদেশিরাও তো জড়িয়ে ছিলাম হৃদয়ের পরম অনুভবে। সেই বার্সেলোনার উদীয়মান বয়সের দিনগুলো থেকে শুরু করে একে একে প্রতিটি পদচিহ্ন অনুসরণ করে যে মানুষটাকে আমরা জীবনের অংশ বানিয়ে নিয়েছিলাম, শেষ ভোরে ঘুম থেকে উঠে তার সেই আবেগঘন প্রস্থান দেখে এ দেশের কোটি কোটি ভক্তের চোখও অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল। বহুদূরের এক মহাদেশের খেলোয়াড় হয়েও মেসি যেভাবে ভোররাতের ঘুম ভাঙানো আনন্দের উপলক্ষ আর গভীর নিঃশ্বাসের কারণ হয়ে উঠেছিলেন, তা যেন ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে ফুটবল আর ভালোবাসার এক অবিশ্বাস্য সেতু তৈরি করেছিল; তাই তার এই বিদায় বাংলাদেশিদের বুকের ভেতরও এক গভীর শূন্যতা আর ভারী ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস রেখে গেল।

সব পরিসংখ্যান ও রূপকথার ঊর্ধ্বে সত্যটি একটাই লিওনেল আন্দ্রেস মেসির মতো আর কোনো ক্রীড়াবিদ পুরো বিশ্বকে টানা দুই দশক ধরে এত সর্বজনীন আনন্দ দিতে পারেননি। বাবার বিদায়বেলার কঠিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত দিনগুলোতেও মাঠে নেমে ভক্তদের টিকিটের মূল্য ফিরিয়ে দেওয়ার যে মানবিক পরাকাষ্ঠা তিনি দেখিয়েছেন, তা ক্রীড়া ইতিহাসে বিরল। তিনি এমন এক ক্ষণজন্মা মহাতারকা, ফুটবলের ক্যানভাসে যার পুনরাবৃত্তি আর কোনো দিন সম্ভব নয়; জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো করেই তাই বলতে হয় ‘এ-পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর’। তিনি রেখে যাচ্ছেন এক অপরাজেয় মানসিকতা ও দিকনির্দেশনা, যা অনুসরণ করে নতুন প্রজন্ম পথ চলবে।

ধন্যবাদ, মেসি ফুটবলকে এতটা সুন্দর করার জন্য!