শিক্ষার্থী রাকিবকে ঘাড় মটকে হত্যা করা হয়

অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে রাকিবুল ইসলাম রাকিবের (১৭) সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে আব্দুল্লাহ আল মামুনের (২৫)। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে মাসখানেক আগে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আসেন রাকিব। ওঠেন শেওড়াপাড়ার একটি মেসে। রাকিবকে কৌশলে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর ফোন করে শুক্রবাদের একটি বাসায় ডেকে নিয়ে যায় মামুন। সেখানে তাদের ধস্তাধস্তিকালে ঘাড় মটকে মারা যান রাকিব। এরপর গুম করতে কার্টনে ভরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নীলফামারী। সেখানে একটি সুপারি বাগানের ভেতরে লাশটি মাটিচাপা দেওয়া হয়।

গতকাল বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ক্রাইম প্রিভেনশন (উত্তর) বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. মহিদুল ইসলাম এ কথা জানান। মহিদুল ইসলাম জানান, রাকিবকে হত্যার পর তার মুক্তিপণ চেয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে হত্যাকারী। রাকিবকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারের সদস্যরা মুক্তিপণের টাকাও দেন। কিন্তু রাকিবকে আর ফিরে পাননি তারা।

মহিদুল ইসলাম বলেন, রাকিবুল ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিল। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একটি কল আসে। শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে যেতে বলা হয় তাকে। এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

কাফরুল থানা পুলিশ সূত্র জানায়, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ জানতে পারে, মুক্তিপণ দাবি করে যে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে কল দেওয়া হয়, সেগুলোর ব্যবহারকারী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মামুন রাকিবকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নীলফামারীর ডিমলায় একটি সুপারি বাগান থেকে কার্টনে ভরা রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, পরিবারের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন মামুন। টাকা না দিলে রাকিবকে হত্যার হুমকি দেন। হুমকি পাওয়ার পর রাকিবের পরিবার বিভিন্ন সময়ে চারটি বিকাশ ও তিনটি নগদ নম্বরে মোট ৪ লাখ টাকা পাঠায়। তারপরও রাকিবকে ফিরে না পেয়ে তার বড় ভাই জহুরুল ইসলাম ঢাকায় এসে কাফরুল থানায় নিখোঁজের জিডি করেন। রাকিব খুন হয়েছে জানার পর তিনি অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় মামলা করেছেন।

হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের সূত্র ধরে গ্রেপ্তার : গত ৫ অক্টোবর রাতে রাজধানীর শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে মামুনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মামুন জানান, কয়েক মাস আগে অনলাইনে রাকিবের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি একটি মার্কেটিং কোম্পানিতে চাকরি করেন। ঢাকায় আসার পর একাধিকবার রাকিব তার বাসায় যান। তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সর্বশেষ গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাসায় গেলে তাকে মারধর করা হয়। মুক্তিপণের টাকা দিতে চাপ প্রয়োগ করেন। তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে ঘাড় মটকে রাকিব মারা যায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাকিবকে হত্যা করার পর মুক্তিপণের টাকা আদায় করতে মামুন নিজেই রাকিবের পরিবারের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেন। কয়েকটি নম্বর থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। টাকা পাওয়ার পর নম্বর বন্ধ করে পালিয়ে যান মামুন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাকিবের মরদেহ একটি কার্টনে ভরে স্কচটেপ দিয়ে মুড়িয়ে মামুন বাড়ির দারোয়ানের সহায়তায় অটোরিকশায় তুলে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান। গাবতলী থেকে বাস ও অন্যান্য যানবাহনে করে নীলফামারীর ডিমলায় নিজের এলাকায় যান মামুন। পরদিন ১৭ সেপ্টেম্বর রাতের আঁধারে বাড়ির সামনে একটি সুপারি বাগানে কার্টনসহ রাকিবের মরদেহ মাটিচাপা দেন।

মহিদুল ইসলাম জানান, মামুনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ডিমলা থানা পুলিশের সহায়তায় ওই সুপারি বাগানে রাকিবের মরদেহ পাওয়া যায়। বড় ভাই জহুরুল ইসলাম মরদেহ শনাক্ত করেন। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

রাকিবের পরিবারের কাছ থেকে মামুন যে ৪ লাখ টাকা নিয়েছিলেন, সেখান থেকে ৫০ হাজার টাকা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। মামুন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চাওয়ায় তাকে গতকাল বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে মহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত কি না, মুক্তিপণের অর্থের লেনদেন এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।