রমজানে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট ঠেকাবে সরকার

আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তাদের জন্য যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, আমদানি ব্যয় কমাতে ফল ও খেজুরের শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ে আলোচনা এবং পণ্য পরিবহন ও খালাসের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজারে নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কনফারেন্স রুমে দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। সভায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা হয়। বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

রমজানের প্রস্তুতি ও ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাইপলাইনে রয়েছে। এসব পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র বা এলসি খোলার কার্যক্রমও স্বাভাবিক রয়েছে। রমজানসহ সারা বছর সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে।

নিত্যপণ্যের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে আমদানি ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ফলের প্রকৃত শুল্কহার ১২১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ফল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে কাজ চলছে। খেজুরের শুল্ক কমানোর বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যাংকঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

ফলের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, শুল্ক পরিশোধের পরও মাল্টা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের অভিযানের পর দাম অনেকটাই কমেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রমজান বা অন্য কোনো উপলক্ষকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের চেষ্টা বরদাশত করা হবে না জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সারা বছর তদারকি চলবে।

সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দেশের লজিস্টিকস ব্যয় ১৬ শতাংশ থেকে নামিয়ে আনতে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো এবং পরিবহন ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানি, পণ্য খালাস ও পরিবহন প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক করা হচ্ছে। এর ফলে যেকোনো স্থান থেকে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে সনদ ডাউনলোড করা যাবে।

পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের আদলে যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঘরে বসে মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ ও আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করে শেয়ার হস্তান্তরের ব্যবস্থা চালুর কাজও চলছে।

আমদানিকৃত শিল্প উপকরণের মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সোডিয়াম সালফেট বা সিনথেটিক লবণ এবং বিটুমিন আমদানিতে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন বা পিএসআই বাধ্যতামূলক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার দীর্ঘদিন ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে ন্যূনতম মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়া ঠেকাতে অন্যান্য আমদানি পণ্যের শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ ১১ বছর বেতন বাড়েনি। মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতায় তৈরি হওয়া ঘাটতি সমন্বয়ের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এই ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়নি এবং এক বছরে ধাপে ধাপে সমন্বয়ের কথা রয়েছে। ফলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এর বাস্তব প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সভায় ব্যবসায়ী নেতারাও রমজানে পর্যাপ্ত ভোগ্যপণ্য সরবরাহের আশ্বাস দেন। সভার সভাপতি ও সিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীরা পুরোপুরি প্রস্তুত।

তিনি বলেন, ডাল, ছোলা, গম, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ প্রধান ভোগ্যপণ্যের কোনো কৃত্রিম সংকট হতে দেওয়া হবে না। বাজারের চাহিদা ও মজুদ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পণ্য খালাস নির্বিঘ্ন রাখতে কাজ করবেন ব্যবসায়ীরা।

চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক চট্টগ্রামকে দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা ও ভোক্তাস্বার্থ রক্ষায় ব্যবসায়ীদের অঙ্গীকারের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ূন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার দূরদর্শী সরকার হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে সক্ষম হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে এমন অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে সরাসরি জাতীয় আমদানি নীতি ও কাস্টমস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করার অনুরোধ জানান তিনি।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, গত রমজানের মতো এবারও চাল, ডাল, ছোলা, গম, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও চিনির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিছু রিফাইনারি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও চালু প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদা পূরণে কাজ করছে।

তিনি বলেন, বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো পণ্যের ঘাটতি দেখা দিলে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। রমজানে সরবরাহব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে ব্যবসায়ীদের হয়রানি এড়িয়ে কাস্টমস, বন্দর ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান তিনি। পণ্য আমদানি ও খালাসে সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন আবদুস সালাম।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ূন মাহমুদ চৌধুরী ও ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমদ, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এম এ সালাম, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কমিশনার আবুল বাসার মো. শফিকুর রহমান এবং সাবেক পরিচালক এস এম আবু তাইয়বসহ ব্যবসায়ী নেতারা।