ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের বাণিজ্যিক উৎপাদন আশির দশকে শুরু হলেও এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে নব্বইয়ের দশকে। সরকারের নীতি সহায়তা, গবেষণা, বেসরকারি বড় বিনিয়োগে বর্তমানে এটি ৫০ হাজার কোটি টাকার একটি খাতে পরিণত হয়েছে। যেখান থেকে ভোক্তার জন্য সস্তায় মাংস ও ডিমের সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। তবে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সারা দেশের ৮০ ভাগ প্রান্তিক খামারিও ডিমের নিয়মিত সরবরাহে ভূমিকা রাখছেন। এই সরবরাহ মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখলেও এই দীর্ঘ সময়েও খামারিদের ডিমের ন্যায্য দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা মেলেনি। মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও বছরের বড় অংশ জুড়েই উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করেন প্রান্তিক এসব খামারি।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে দেশে ডিমের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৪৯৩ কোটি। যা সবশেষ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে গিয়ে ঠেকেছে ২ হাজার ৫০৯ কোটিতে। এই এক দশকে উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতিদিন ৬ কোটির বেশি ডিম উৎপাদন হচ্ছে। এই উৎপাদনের ৮০ শতাংশই আসে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে। সস্তা প্রোটিনের সহজলভ্য এই জোগান যারা নিরবচ্ছিন্নভাবে দিয়ে যাচ্ছেন, তারাই আবার বছরের বেশিভাগ সময় থাকেন বিপদে। কারণ বেশিরভাগ সময়ই খামারিদের ডিম বিক্রি করতে হয় উৎপাদন খরচের চেয়ে কমে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোলট্রি ফিড, বাচ্চা, ওষুধ ও জ¦ালানির দাম বাড়ায় খামার পর্যায়ে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও সরবরাহ চেইনের ত্রুটির কারণে খামারিদের বিক্রয়মূল্য (ফার্ম-গেট প্রাইস) এবং খুচরা বাজারের মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। ফলে প্রান্তিক খামারিরা লোকসানে পড়ছেন।
জানা গেছে, বর্তমানে খামারি পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ১০ টাকা ৫০ পয়সা বা তারও বেশি। তবে প্রতিটি ডিম খামারিরা বিক্রি করছেন গড়ে ১১ টাকা ১১ পয়সায়। অথচ ফিডের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে উৎপাদন খরচ।
বগুড়া সদরের পোলট্রি খামারি হাফিজুর রহমান বলেন, গত ২০ থেকে ২৫ দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ খাবারের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। তবে ব্রান ও ভুট্টার দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ৫০ কেজির এক বস্তা ব্রানের দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। ভুট্টার দাম কেজিতে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকা হয়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
তিনি বলেন, এই অবস্থায়ও ডিমের উৎপাদন-খরচের চেয়ে কমে আমাদের ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ আমরা বাজার নির্ধারণ করতে পারি না। বাজার যেভাবে দাম ঠিক করে দেয়, সেটার ওপরই আমাদের ভরসা করতে হয়। যদিও ঢাকার বাজারে এখন প্রতিটি ফার্মের মুরগির বাদামি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩ টাকা বা তারও বেশি দামে। অর্থাৎ উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রায় ২ টাকা বেশি দামে বাজারে ডিম বিক্রি হচ্ছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, সারা বছর উৎপাদনকারীদের প্রতিটি ডিমে কয়েক পয়সা লাভ তোলাও দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খারাপ অবস্থা গেছে কদিন আগে। ফিডের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে গত চার মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পথে নেমেছেন খামারিরা। কারণ তারা উৎপাদন খরচের কমে ৮ থেকে ৯ টাকা দরে প্রতিটি ডিম বিক্রি করছেন।
তবে উৎপাদনকারীরা জানান, ডিমের দাম যখন বেড়ে যায় সরকার সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু যখন দাম একেবারে কমে আসে তখন ভোক্তার উপকার হয়, কিন্তু খামারি সর্বশান্ত হয়ে যায়; লোকসানের ভার বেড়ে যায়। তবে সরকার খামারির সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্য ঠিক করে দেয় না।
প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ) এর তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত লেয়ার (ডিম উৎপাদনকারী) খামারের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। এর মধ্যে ২০ হাজার ৪৬৪টি নিবন্ধিত।
বিপিআইএ এর সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, ডিমের দাম বৃদ্ধি নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। বলা হচ্ছে ,খামারিরা ডিমের দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু খামার থেকে বাজার পর্যন্ত ডিম আসতে মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে বাজারে ডিমের দাম বাড়ছে। এই মধ্যস্বত্বভোগীরাই মূলত প্রতিটি ডিমে দুই টাকা বা তারও বেশি নিয়ে থাকে। খামারিরা যাতে করে ডিম সরাসরি বাজারে আনতে পারে, এমন একটি সরবরাহ চেইন তৈরি করতে হবে। খাদ্যমূল্য কমাতে হবে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্টাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) আহ্বায়ক মশিউর রহমান বলেন, খামারিরা বছরের বেশিরভাগ সময়েই ডিমের উৎপাদন খরচ পাওয়া নিয়ে সংকটে থাকেন। সরকারের হিসেবে উৎপাদন খরচের তালিকা থাকলেও সর্বনিম্ন মূল্য বেঁধে দেওয়া হয় না। তবে ডিমের দাম বেড়ে গেলে তখন আবার সর্বোচ্চ মূল্য বেঁধে দেওয়া হয়। এ কারণে উৎপাদনকারীর ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হয় না।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খামারি দাম না পেলেও তার উৎপাদন বন্ধ করে দেন না। কারণ এটা এমন একটা প্রক্রিয়া যেখান থেকে চাইলেই বেরিয়ে আসা যায় না। কারণ বিনিয়োগ করে ডিম দেওয়ার উপযোগী মুরগি তৈরি করার পর তাকে থামিয়ে দেওয়া যায় না। আশায় থাকতে হয়, কখন এটা বাড়বে।
এর খানিকটা প্রমাণ মেলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, নির্ধারিত মানদ- অনুযায়ী প্রতি বছর একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের অন্তত ১০৪টি ডিম খাওয়া উচিত। তবে বাংলাদেশে এখন ডিমের প্রাপ্যতা এফএও-নির্ধারিত সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেব বলছে, প্রতি বছর এখন বাংলাদেশে একেকজন মানুষের জন্য ১৪০টির বেশি ডিমের সরবরাহ থাকে।
তবে সরকার ও খাত সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য আরও দূরে। ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু ডিমের উৎপাদন বছরে ২০০টিতে নিয়ে যেতে চান তারা। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানিতেও রয়েছে বিশেষ মনোযোগ।
এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শুক্রবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস। এবারের ডিম দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে, ‘ডিমের উচ্চমানের সম্পূর্ণ প্রোটিনের গুরুত্বকে তুলে ধরা, যা পেশী বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুস্থ বার্ধক্যে সহায়তা করে।’