ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীলতার মেলবন্ধন

২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন কানাডিয়ান খ্যাতনামা লেখক অ্যান কারসন। ঐতিহ্যবাহী ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সাবলীল ও উদ্ভাবনী সংলাপে সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ সৃষ্টির স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত করেছে নোবেল কমিটি। গতকাল বৃহস্পতিবার রয়্যাল সুইডিশ একাডেমির পক্ষ থেকে তাকে ফোন করে এ সম্মাননার কথা জানানো হয়। অ্যান কারসন ১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও অনুবাদের পাশাপাশি আজীবন কাব্যচর্চা করে গেছেন। কবিতা ও গদ্যের মিশ্রণে তৈরি ব্যতিক্রমী লেখার জন্য পরিচিত তিনি। পাশাপাশি সমকালীন গল্পের সঙ্গে প্রাচীন পুরাণের সমন্বয়ও তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

কারসনের প্রায় পুরো সাহিত্যকর্মই গড়ে উঠেছে শব্দের প্রতি ভাষাবিদের গভীর অনুরাগ এবং নতুন অর্থের প্রতি কবির তীব্র আকাক্সক্ষার মেলবন্ধনে। তিনি নিজেও তার প্রতিটি সৃষ্টির মূল প্রেরণা হিসেবে শব্দের ব্যুৎপত্তিকে চিহ্নিত করেছেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ বইটি কারসনের সাহিত্যভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বইটিতে প্রেম, আকাক্সক্ষা ও দূরত্বের সম্পর্ক নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। ১৯৯০-এর দশকে কারসন ধারাবাহিক কিছু সাহিত্যকর্ম উপহার দেন। এর মধ্যে ‘গ্লাস, আইরনি, অ্যান্ড গড’ (১৯৯৫) গ্রন্থে সংকলিত ‘দ্য গ্লাস এসে’ অন্যতম। একই দশকে প্রকাশিত হয় কারসনের বহুল প্রশংসিত ও শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড : এ নভেল ইন ভার্স’ (১৯৯৮)। এতে গ্রিক পুরাণের বীর হেরাক্লিসকে নিয়ে লেখা একটি কবিতার নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে এবং সমকামী এক তরুণের বেড়ে ওঠার গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

ধ্রুপদি গ্রিক ভাষা থেকে তার অনুবাদগুলোকে স্বাধীন সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাফোর খণ্ডিতাংশের অনুবাদ ‘ইফ নট, উইন্টার’ (২০০২), সোফোক্লিসের ট্র্যাজেডি ‘ইলেক্টরা’ (২০০১) ও ‘অ্যান্টিগোনে’ (২০১৫) এবং ইউরিপিদিসের ‘বাখাই’ (২০১৫)। ২০১০ সালে প্রকাশিত ‘নক্স’ বইটিও তার ব্যতিক্রমী কাজগুলোর একটি। মৃত ভাই মাইকেলের স্মৃতি কেন্দ্র করে বইটি তৈরি। ছবি, চিঠি ও বিভিন্ন লেখা একটি বাক্সের মধ্যে সাজিয়ে তিনি বইটি এক ধরনের শিল্পকর্মের রূপ দিয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন রোমান কবি ক্যাটুলাসের ভাইকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা।

তার ২০২৪ সালের রচনা ‘রং নরমা’ বিভিন্ন গ্রন্থের এক বৈচিত্র্যময় সংকলন, যেখানে একটি শক্তিশালী পারফরমেটিভ দিক রয়েছে। নৃত্যশিল্পী এবং অপেরা ও থিয়েটার পরিচালকদের সঙ্গে তার যৌথ কাজগুলো সাহিত্যিক নিয়মকানুন ও প্রত্যাশার ঊর্ধ্বে তার অবাধ স্বাধীনতাকেই প্রকাশ করে। মূলত এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই ১৯৯০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক শিল্প ও সাহিত্য অঙ্গনে তার কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান অ্যান্ডার্স ওলসনের মতে, কারসনের লেখার মাধ্যমে কবিতা, প্রাচীন সাহিত্য, আধুনিক সাহিত্য ও বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের মধ্যে নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই স্বাধীন ও পরীক্ষামূলক লেখার ধরনই সমকালীন আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে কারসনের কাজকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।