আবরারের নামে বুয়েটে হল দাবি পরিবারের

নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনে নিহত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সে সময় আবরার ফাহাদের নামে বুয়েটে একটি হল নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা সচিবের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিষয়টি বিবেচনার করার আশ্বাস দেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ হয়। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এ কথা জানিয়েছেন। 

 সে সময় আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহ, মা রোকেয়া খাতুন, ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ, এক মামা ও এক চাচা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সার্বিক খোঁজখবর নেন।

সাক্ষাৎকালে আবরার ফাহাদের বাবা তার ছেলেকে হত্যার মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর করার দাবি জানান এবং কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ও এখনো গ্রেপ্তার না হওয়া পলাতক আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন এবং আদালত স্বাধীনভাবে বিচারকাজ সম্পন্ন করবে। সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

এ ছাড়া কুষ্টিয়ায় গড়াই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানালে প্রধানমন্ত্রী তা দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন এবং সেতুটি আবরার ফাহাদের নামে নামকরণের প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে আবরারের কবর পাকাকরণ ও পাশের মসজিদটির নির্মাণকাজ অবিলম্বে শেষ করার নির্দেশনা দেন তিনি।

আবরারের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘প্রত্যেক ক্যাম্পাসের ছেলেমেয়েই আমার মতো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। আমি চাই, কোনো ক্যাম্পাসেই যেন আর আগের মতো পরিবেশ ফিরে না আসে। আমার মতো কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।’

আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ বুয়েটে আবরার ফাহাদের নামে একটি নতুন হল নির্মাণ এবং নতুন প্রজন্মকে তার বিষয়ে জানাতে পাঠ্যবইয়ে ঘটনাটি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। আবরার ফাইয়াজ তার ভাই আবরার ফাহাদসহ বিভিন্ন সময়ে নিহতদের একটি তালিকা তৈরির দাবি জানালে প্রধানমন্ত্রী জানান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সাক্ষাৎকালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির উপস্থিত ছিলেন।

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আবরারের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামে। হত্যাকা-ের আগের দিন, ৫ অক্টোবর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আবরার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে স্বাক্ষরিত কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতার সমালোচনা করেন। মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ, ফেনী নদীর পানি এবং গ্যাস রপ্তানি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

পরের দিন রাতে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা তাকে হলে ডেকে নিয়ে ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং একপর্যায়ে মারধর করেন। পরে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে হলের সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়। ময়নাতদন্তে অতিরিক্ত মারধরের কারণে তার শরীরে গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। হত্যাকা-ের পর বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের শাস্তিসহ ১০ দফা দাবি জানান। ৭ অক্টোবর আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলার রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদ- এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেন। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট ওই রায় বহাল রাখে। পরে মৃত্যুদ- বহাল থাকা ৯ আসামি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করে। যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত এক আসামিও লিভ টু আপিল করে। মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।

গণপরিবহনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক : সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ঢাকা মহানগরের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গণপরিবহনের বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা নিরসনে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এ কথা জানিয়েছেন।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎ : ডিপি ওয়ার্ল্ডের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান এসা কাজিমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপসহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক এ কথা জানিয়েছেন।

 সে সময় চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা ও আধুনিকায়নে বাংলাদেশ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৫ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তি নিয়েও আলোচনা হয়।

চুক্তির আওতায় কনটেইনার টার্মিনাল ও এর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী ফ্রি ট্রেড জোন এবং রেলভিত্তিক ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো স্থাপনে এবং বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিদলের আগ্রহের কথা জানতে চান। প্রতিনিধিদল এসব খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে।

প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ গড়ে তোলার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ গড়ে তুলে শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য সুস্থ, সুন্দর ও ক্রীড়াবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে আগামী দুই মাসের মধ্যে সারা দেশে কমপক্ষে ১ হাজার খেলার মাঠ স্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এ কথা জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ইউনিয়নভিত্তিক খেলার মাঠ স্থাপন ও ক্রীড়া কার্যক্রম সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতি দুই থেকে তিনটি ওয়ার্ডের জন্য অন্তত একটি করে খেলার মাঠ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। এর অংশ হিসেবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪০টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯০টি মাঠ খেলাধুলার উপযোগী করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল ও ব্যাডমিন্টনসহ ১০টি ক্রীড়া ইভেন্টে প্রায় ১৪ লাখ কিশোর-কিশোরীকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী খুলনা থেকে একযোগে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় এ ক্রীড়া কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

বৈঠকে বিদ্যমান উপজেলা স্টেডিয়ামগুলো সচল ও খেলাধুলার উপযোগী করা, দখল হয়ে যাওয়া খেলার মাঠ উদ্ধার এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত খেলাধুলা ও ক্রীড়া ক্লাব কার্যক্রম চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন উপস্থিত ছিলেন।