চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা এবং পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন বগাকা-ে খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমকে বদলি করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে বগা অবস্থান করছেন এমন সংবাদের ভিত্তিতে একদল পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। তখন চসিক কার্যালয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযান নিয়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন প্রশ্ন তোলার কয়েক ঘণ্টা পর তাকে নগর বিশেষ শাখায় (এসবি) বদলির আদেশ জারি করেন মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।
গত বুধবার নগরের এক অনুষ্ঠানে মেয়র শাহাদাত অভিযোগ করে বলেন, ‘তিনি (রহিম) আওয়ামী লীগ আমলে বাকলিয়ায় ওসি ছিলেন। তাহলে এখন তিনি কীভাবে খুলশীর ওসি হলেন? খুলশী থানার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি আওয়ামী লীগ বা যুবলীগের কাউকে গ্রেপ্তার করেননি।’ পুলিশের ভাষ্য, বগা পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, হামলা, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং বিস্ফোরক আইনে ২৩টি মামলা রয়েছে। সরকারি জমি দখলকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর গত ৮ জুন বগাকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
গত মঙ্গলবার রাতের ঘটনা এবং ওয়াকিলকে পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগ প্রসঙ্গে মেয়র শাহাদাত বলেন, ‘কোনো সাংবাদিক যদি প্রমাণ করতে পারেন যে ওয়াকিল আমার সঙ্গে চলে গেছে, তাহলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব। আর তারা যদি সেটা প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করব।’ বগা আওয়ামী লীগের অপশাসনের শিকার উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ‘বগা আওয়ামী লীগের কোনো অপরাধী নন। তিনি আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন এবং ১৭ বছর সংগ্রাম করেছেন। বগা একজন জুলাইযোদ্ধা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা করা হয়েছিল।’
গত ২৯ সেপ্টেম্বর খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির ৪ নম্বর গলিতে বগার অফিসে কিশোর গ্যাং সদস্য মো. হৃদয়কে ডেকে নেয় কামরুল নামে আরেক কিশোর। বগার অফিস থেকে বের হওয়ার পর পরই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা হৃদয়কে ছুরিকাঘাত করে। পরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যায় হৃদয়। হৃদয় হত্যাকা-ে কামরুলসহ ছয়জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশের তথ্য অনুয়ায়ী, খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনিতে ‘ফাইভ স্টার’ গ্রুপ ও ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপ নামে দুটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। নিহত হৃদয় ফাইভ স্টার গ্রুপের সদস্য ছিল। দুই সপ্তাহ আগে দুই গ্রুপের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে কথাকাটাকাটির জেরে হৃদয়কে ছুরিকাঘাত করে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের সদস্যরা। ফাইভ স্টার গ্রুপের সদস্যরা খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিনের অনুসারী। অন্যদিকে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন পুলিশ পেটানোর হুমকিদাতা ২৩ মামলার আসামি বগা এবং তার ভাই রকিবুল হোসেন। আর এই দুই গ্রুপের বড়ভাই হিসেবে পরিচিত বগা, তার ভাই রকিবুল ইসলাম এবং হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে এলাকায় অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, জায়গা দখল, মাদক ব্যবসা কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনজনই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মেয়র শাহাদাত অভিযোগ করেন, ‘খুলশীতে হৃদয় হত্যা মামলায় ওসি (রহিম) আসামি কামরুলকে মারধর করে বগার নাম বলতে বাধ্য করেছেন। রহিম আওয়ামী লীগ আমলের একজন ওসি ছিলেন। সে কারণেই তিনি এখন খুলশীতে ইচ্ছাকৃতভাবে যুবদল ও ছাত্রদলকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছেন।’ আসন্ন চসিক নির্বাচনকে ঘিরে ষড়যন্ত্র চলছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনের আগে তারা পরিকল্পিতভাবে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং ওসি তাদের সঙ্গে জড়িত।’
ওসি আবদুর রহিমের বদলির বিষয়ে নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ‘এটি নিয়মিত বদলি। মেয়র কী বলেছেন, সেটা শুনিনি।’ এর আগে চলতি বছরের আগস্টে পাহাড়তলী কলেজের এক শিক্ষককে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগ আসে থানায়। ওসি আবদুর রহিম বগার বিরুদ্ধে অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার পর বগা ফোনে ওসিকে গালাগাল ও হুমকি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, ওই মামলায় বাগাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে ৪ সেপ্টেম্বর নগরের ওয়্যারলেস এলাকায় তিনি ও তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায় এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। হামলায় ওসিসহ পুলিশের সাত সদস্য আহত হন। ১৩ সেপ্টেম্বর বগার বাবা মোহাম্মদ জাবেদ ওসিসহ খুলশী থানার দুই এএসআই এবং আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ৪ সেপ্টেম্বর পুলিশের অভিযানের সময় তারা বগাকে মারধর ও তাদের বাড়িতে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন। আদালত অভিযোগটি গ্রহণ করেন এবং তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।