চিঠিতে নয়, বাক্সে যায় আবেগ

একসময় দূরের প্রিয়জনের কাছে মনের কথা পৌঁছানোর একমাত্র ভরসা ছিল চিঠি। খামের ভেতর যতœ করে লেখা কয়েকটি লাইন, কখনো শুকনো ফুল, কখনো প্রিয় মানুষের হাতের লেখা চিঠির সঙ্গে পৌঁছে যেত মায়াভরা ভালোবাসা, আবেগ। অপেক্ষা থাকত ডাকপিয়নের। ডাকপিয়ন এসেছে, শুনলেই বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠত হয়তো প্রিয়জনের চিঠি এসেছে!

সময় বদলেছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে মুঠোফোন, মুহূর্তেই বার্তা, ছবি কিংবা ভিডিও পৌঁছে যায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ফলে কাগজের চিঠি মানুষের হাতে হাতে আর ঘোরে না। ডাকপিয়নের অপেক্ষায় জানালায় দাঁড়িয়ে থাকার সেই দিনও অনেকটাই অতীত। কিন্তু ভালোবাসা, মমতা আর প্রিয়জনের জন্য কিছু একটা পাঠানোর আকুলতা তো শেষ হয়নি। চিঠির খাম বদলে গেছে বাক্সে। হাতে লেখা কয়েকটি লাইনের জায়গা নিয়েছে মায়ের রান্না, গ্রামের বাড়ির মাছ, প্রিয়জনের উপহার কিংবা প্রয়োজনীয় কোনো সামগ্রী। বদলে গেছে ডাক বিভাগের সেবার ধরনও। মানুষের আবেগ কমেনি। সেই আবেগই এখন বাক্সবন্দি হয়ে ছুটছে এক ঠিকানা থেকে আরেক ঠিকানায় ডাক বিভাগের হাত ধরে।

ডাক বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ডাক সার্ভিস) মো. জাকির হোসেন নুর বলেন, প্রিয় কন্যা দূরদেশ থেকে আবদার করেছে মায়ের রান্না করা সরিষা-ইলিশের তরকারি খাবে। কী উপায়! মায়ের তো মন মানে না। মেয়ের আবদার পূরণ করতে চায়। ডাক বিভাগ থার্মাল বক্সে করে যতেœর সঙ্গে সুরক্ষিত ওই মায়ের রান্না করা খাবার পৌঁছে দিচ্ছে মেয়ের কাছে। তা হোক দেশে কিংবা বিদেশে।

তিনি জানান, থার্মাল বক্সে খাবারের গুণগত মান ৭২ থেকে ৯৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ধরে রাখা যায়। অর্থাৎ, দূরত্ব যতই হোক, মায়ের হাতের রান্নার স্বাদটুকু অক্ষুণœ রেখেই সন্তানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে ডাক বিভাগ।

শুধু তরিতরকারি নয় কাঁচাবাজার, মাছ-মাংস, ফলমূল, প্রিয়জনকে দেওয়া গিফট, এমনকি রেশনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যও এখন পার্শ্বেলের মাধ্যমে পাঠানো যায়। আর এই সেবার পরিধিও বাড়ছে দ্রুত। ডাক বিভাগ বর্তমানে ১২৬টি দেশে স্বল্প খরচে পার্শ্বেল পাঠানোর সেবা দিচ্ছে। এর ব্যবহার কতটা বেড়েছে, তার চিত্র পাওয়া যায় পরিসংখ্যানেও। ২০২৪ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ৭৭ মেট্রিক টন, ২০২৫ সালে ২৪৩ মেট্রিক টন এবং ২০২৬ সালের একই সময়ে ৩২১ মেট্রিক টন পার্শ্বেল বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছে ডাকবিভাগ। উক্ত সময়ে সেবার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩১ শতাংশ।

খরচও তুলনামূলক কম। কেজিপ্রতি পণ্য পাঠাতে ডাকবিভাগ নেয় মাত্র ৮ টাকা। তবে পণ্য এক কেজি বা তার কম হলে সর্বনিম্ন চার্জ ১৬ টাকা। বেশি হলে মোট পণ্যের ওপর একবার বাড়তি ৯ টাকা চার্জ করা হয়।

আজ ৯ অক্টোবর, বিশ্ব ডাক দিবস। দিনটি উপলক্ষে জাতীয়ভাবে ডাক বিভাগের বিভিন্ন পরিসেবা জনপ্রিয় করে তুলতে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে সরকার।

ডাক বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ডাক সার্ভিস) বলেন, একসময় চিঠি ছিল ডাক বিভাগের প্রাণ। চিঠির জন্যই পোস্ট অফিস চিনত মানুষ। কিন্তু চিঠির গুরুত্ব কমে গেলে সারাদেশে বিস্তৃত ১ হাজার ৬০০ পোস্ট ও সাব-পোস্ট অফিস বড় একটি কাজ হারায়। এক পর্যায়ে বহুজাতিক পণ্য পরিসেবা প্রতিষ্ঠান দারাজের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ডাকবিভাগ পণ্য ডেলিভারির কাজ করে। সেখানকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ডাকবিভাগ পণ্য পরিবহন পরিসেবা চালু করে। দিনে দিনে এই সেবার পরিধি বাড়ছে।

তিনি জানান, আগে পার্শ্বেল পাঠাতে ডাক বিভাগকে মূলত রেলপথের ওপর নির্ভর করতে হতো। সম্প্রতি সড়কপথে এই সেবা দেওয়ার কাজ শুরু হওয়ায় বেড়েছে সেবার মান, গ্রাহক সন্তুষ্টি ও চাহিদা। এখন দেওয়া হচ্ছে টাইম-বাউন্ড সেবা। বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসে ব্যয় বেশি হওয়ায় ডাকবিভাগের গ্রাহকও বাড়ছে। ই-কমার্স এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডকুমেন্টও এখন পার্শ্বেল হিসেবে আসছে ডাক বিভাগে।

মো. জাকির হোসেন নুর বলেন, চাহিদা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সক্ষমতা বাড়াতেও উদ্যোগ নিয়েছে ডাক বিভাগ। এর অংশ হিসেবে একটি ‘ফ্রাঞ্চায়েজি’ চালুর পাইলটিং চলছে। প্রতিটি ‘ফ্রাঞ্চায়েজি’ ডাক বিভাগের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দেশ-বিদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকদের সেবা দেবে। এর মাধ্যমে দেশব্যাপী কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

তবে ডাকবিভাগের কাজ শুধু চিঠি কিংবা পার্শ্বেল পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রয়েছে ডাক সঞ্চয় ব্যাংক। এই ব্যাংকে সঞ্চয় নিরাপদ এবং মুনাফা প্রায় ১১ শতাংশের মতো। প্রতি ৩ বছরে ওই সঞ্চয়ের মুনাফা বিতরণ করা হয়। তবে ওই মুনাফা ঘূর্ণায়মান বা চক্রবৃদ্ধি হারে নয়। একক নামে সর্বোচ্চ ১০ লাখ এবং যৌথ নামে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় জমা রাখা যায় ডাক সঞ্চয় ব্যাংকে।

সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রিও ডাক বিভাগের আরেকটি সেবা। রয়েছে মোবাইল মানি অর্ডার। এই সেবাতেও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ডাক বিভাগ। প্রেরকের টাকা দ্রুত ও নিরাপদে প্রাপকের ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফারের সেবা চালু করতে কাজ চলছে। এর পাশাপাশি ডাক বিভাগ জীবন বীমার সেবাও দিয়ে আসছে। এটি ডাক বিভাগের প্রায় ২০০ বছরের পুরনো সেবা।

এ ছাড়া, সারাদেশে যত জমি রেজিস্ট্রি হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় রেভিনিউ স্ট্যাম্প ছাপা ও সরবরাহ করাও ডাক বিভাগের একটি বড় কাজ।

বহুল আলোচিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ‘নগদ’ মূলত ডাক বিভাগের একটি লাইসেন্স। এই লাইসেন্স ব্যবহার করে নগদ পরিচালনা করছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। কোম্পানিটির লেনদেন, নেটওয়ার্ক ও এসএমএস সেবা থেকে আয়ের ৫১ শতাংশ পায় ডাক বিভাগ। সরাসরি ওই অর্থ সরকারের ট্রেজারিতে জমা করে ডাক বিভাগ। অবশিষ্ট ৪৯ শতাংশ নেন কোম্পানির উদ্যোক্তারা। এই আয় থেকেই কোম্পানিটির পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করা হয়।