ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশটির রাজনীতি। বিরোধী দলগুলোর ‘ইন্ডিয়া জোট’ রাজধানী দিল্লিতে টানা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। একই দাবিতে সরব হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টিও (সিজেপি)। সিইসির পদত্যাগ এবং বিতর্কিত ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে বিশাল বিক্ষোভ শুরু দলটি। গতকাল বৃহস্পতিবার আয়োজিত এই বিশাল বিক্ষোভে যোগ দেন অভিনেতা-সমাজকর্মী প্রকাশ রাজ এবং জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। সেখানে ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগে একটি ‘জনগণের ট্রাইব্যুনাল’-এর আয়োজন করা হয় এবং পরে একটি ‘চপ্পল বিক্ষোভ’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে বিভিন্ন কর্মী ও সুশীল সমাজের সংগঠনের মানুষরা ভিড় জমাতে শুরু করেন। দুপুরে সেখানে পৌঁছান সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাসহ অনেকেই। তাদের সঙ্গে একই মঞ্চে দেখা যায় ধ্রুব এবং প্রকাশকে। সেখান থেকেই এসআইআর বাতিলের দাবি জানান তারা। এরপর ‘ভোট চোর’, ‘ভোট চোর’ সেøাগানে মুখরিত হয়ে ওঠে বিক্ষোভস্থল। সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে অভিনেতা প্রকাশ রাজ বলেন, নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) এসআইআর অনুশীলনের মাধ্যমে ‘পুরো দেশকে অপমানিত করেছে’।
তিনি বলেন, এই দেশে আগে মানুষ ঠিক করত কে সরকার গঠন করবে, কিন্তু এসআইআর-এর মাধ্যমে এখন সরকার ঠিক করছে কে ভোট দেবে। ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ১৩ কোটির বেশি মানুষের নাম বাদ পড়ার এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান তিনি। প্রকাশ রাজ আরও বলেন, এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য শুধু সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে সরানো নয়, বরং এসআইআর বাতিল করা।
এই বিক্ষোভে যোগ দিতে জার্মানি থেকে ভারতে এসেছেন ধ্রুব রাঠি। এই আন্দোলনকে তিনি ‘গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই’ বলে অভিহিত করেছেন। এই লড়াইকে সাধুবাদ জানিয়ে ধ্রুব রাঠি কর্নাটকের ১০০টি পোলিং স্টেশনের এসআইআর অনিয়মের ওপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তাদের জবাবদিহি করতেই হবে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, ‘জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করা হচ্ছে। এটি ‘গণতন্ত্রের মৃত্যু’। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, নির্বাচন কমিশনের ভেতরেই ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা ও ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে একাধিকবার আপত্তি তুলেছিলেন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশি। বিক্ষোভে এমন বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন যাদের নাম এসআইআর চলাকালে খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সিজেপির দাবি, একই জায়গায় বসবাস করা সত্ত্বেও তাদের নাম ‘স্থানান্তরিত’ বা ‘অনুপস্থিত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পরে দিল্লির যন্তর মন্তরে এক প্রতিবাদ সমাবেশে দিল্লি পুলিশের এক কর্মীর বিরুদ্ধে মহিলা সাংবাদিকদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রতিবাদে সংহতি জানিয়ে ‘চপ্পল বিক্ষোভ’ করে সিজেপি। গত সপ্তাহে মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কেও সিজেপির এমন বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে প্রবীণ অভিনেতা শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ ও গায়ক বিশাল দাদলানি উপস্থিত ছিলেন। ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া এই সংগঠনটি তাদের আন্দোলনের তৃতীয় ধাপের অংশ হিসেবে আবারও যন্তর মন্তরে ফেরার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
দিল্লিতে নামছে ২৩ হাজার সশস্ত্র পুলিশ
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দল ও সিজেপি বিক্ষোভকে ঘিরে ভারতের রাজধানীতে ২৩ হাজার সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে। এনডিটিভি জানিয়েছে, পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে সতর্কতা জারির পাশাপাশি দিল্লিতে নেওয়া হচ্ছে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। সূত্রমতে, দেশটির কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) ২৩ হাজার সদস্যকে ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ সমাবেশের দিন দিল্লিতে মোতায়েন করা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে আগামী ১২ অক্টোবর পর্যন্ত সিএপিএফ-এর ২২১ কোম্পানি সদস্যকে রাজধানীজুড়ে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে ভারতের ইউনিয়ন হোম মিনিস্ট্রি। এর বাইরে দিল্লি পুলিশের অধীনে আরও ১১০ কোম্পানি সিএপিএফ সদস্য থাকবে।
এছাড়া বিক্ষোভের সময় দিল্লি পুলিশের আরও ২০ হাজার অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জুলাইয়ে সিজেপির যন্তর মন্তর বিক্ষোভের সময় প্রায় ১৫০ কোম্পানি সিএপিএফ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। কৃষক আন্দোলনের সময় মোতায়েন করা হয়েছিল ৯৩ কোম্পানি। সেদিক থেকে বলতে গেলে শনিবারের (১০ অক্টোবর) বিক্ষোভে জুলাইয়ের দ্বিগুণের বেশি এবং কৃষক আন্দোলনের প্রায় চারগুণ সিএপিএফ সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত এসেছে।