জরাজীর্ণ মাটির ঘরেই চলছে ৫০ বছর ধরে ডাকসেবা

একসময় বন্ধু, স্বজন কিংবা পরিবারের সদস্যদের চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন অনেকেই। এখন আধুনিক প্রযুক্তির ফলে যোগাযোগ সহজ হয়েছে। প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে চিঠির ব্যবহার। দাপ্তরিক কাজ ছাড়া ব্যক্তিগত পর্যায়ে চিঠির ব্যবহার আর হয় না বললে চলে। তাই স্বাভাবিকভাবে আর কদর নেই ডাকবাক্সের। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক ডাকঘর। এর মধ্যে জরাজীর্ণ দেহ নিয়ে বুক ফুলিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার তৈলারদ্বীপ উপ-ডাকঘর। এই ডাকঘর থেকে আশপাশের কয়েকটি গ্রামে প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় চিঠি বিলি হয়।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর তথ্যপ্রযুক্তির জোয়ারে দেশজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছে ডিজিটাল সেবা। আর তখনই উপজেলার সরকারহাটের পাশে এক টুকরো ব্যতিক্রম—মাটি আর ধানের তুষে তৈরি একটি ক্ষুদ্র ঘরে চলছে ডাকসেবা। ডাকঘরটির কোনো নিবন্ধিত সরকারি ভবন নেই। স্থানীয় সংসদ সদস্য সারওয়ার জামাল নিজামের পরিবারের মৌখিক অনুমতিতে বসানো হয় ডাকঘরটি। তাদের পূর্বপুরুষদের তৈরি এই মাটির ঘরে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরেই চলছে দাপ্তরিক কার্যক্রম।

২০১৭ সালে এটিকে ‘ই-পোস্ট সেন্টার’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে কাগুজে-কলমে ‘ই-পোস্ট সেন্টার’ হলেও এখানে নেই কম্পিউটার-প্রিন্টার বা ইন্টারনেট সংযোগ। তেমনি নেই উদ্যোক্তাও। ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া এসব যন্ত্রপাতি এখনো পড়ে রয়েছে পটিয়া ডাকঘরে। এ কারণে গেল ১০ বছরে একদিনও চলেনি ডিজিটাল সেবা। আধুনিকতার ছোঁয়া না লাগলেও, এই পুরোনো কাঠামো এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এলাকার ডাকসেবার একমাত্র ভরসা হয়ে।

১০ বাই ১২ ফুট আয়তনের ছোট্ট ঘরটিই বর্তমানে এই অঞ্চলের মানুষের চিঠিপত্র পাঠানো ও গ্রহণের কেন্দ্র। আধুনিকতা থেকে বহু দূরে এই ডাকঘরের ওপর নির্ভর করে আশপাশের অন্তত ছয় কিলোমিটার এলাকার বাসিন্দারা। কর্মী মাত্র দুজন—পোস্টমাস্টার মোহাম্মদ আমির হোসেন ও চিঠি বিলিকারক মিজানুর রহমান। এই ডাকঘরে সরকারিভাবে বরাদ্দ আছে তিনটি চেয়ার ও একটি টেবিল। রেজিস্টার খাতা-কলমসহ আনুসঙ্গিক খরচের বরাদ্দ মাসিক ১৫ টাকা। নিজেদের সামর্থ্য দিয়েই বছরের পর বছর ধরে এই সেবা চালু রেখেছেন তারা।

পোস্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, তৈলারদ্বীপ উপ-ডাকঘরটি পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন ওআর নিজাম পরিবারের মৌখিক অনুমতিতে তাদের একটি টিনের চালা মাটির ঘরে ডাকঘরটি চালু করা হয়। এরপর থেকে সেটি আর সংস্কার করা হয়নি। নির্মাণ করা হয়নি কোনো নতুন ভবনও।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাটির ঘরের টিনের চালায় মরিচা ধরে ছিদ্র হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই চালা দিয়ে পানি পড়ে সবকিছু ভিজে যায়। কাগজপত্র রাখতে হয় পলিথিনে ঢেকে। দরজা-জানালা ভাঙা। রয়েছে নিরাপত্তার সমস্যাও। মাটির দেয়ালের নিচের অংশে তুষের প্রলেপ ঝরে পড়ছে। যেকোনো সময় ঘরটি ভেঙে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। দেখে মনে হয় পরিত্যক্ত মাটির ঘর পড়ে আছে। অথচ সেখানেই বছরের পর বছর ধরে চলছে কার্যক্রম।

ডাকঘরের রেজিস্টার খাতা অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসের ২২ কর্মদিবসে এই কেন্দ্র থেকে ৩২৪টি চিঠি বিলি করা হয়েছে, তার মধ্যে রেজিস্টার্ড চিঠি ৩০৩টি ও সাধারণ চিঠি ২১টি। বিলি করা চিঠির বেশিরভাগই সরকারি ও চাকরিসংক্রান্ত, ব্যক্তিগত চিঠির সংখ্যা এখন একেবারেই নগণ্য।

তৈলারদ্বীপ উপ-ডাকঘরের পোস্টমাস্টার আমির হোসেন জানান, ‘ঘরের ছাদে টিন ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে, দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব, দরজা-জানালায় ঘুণ ধরেছে। বিদ্যুৎ বিল থেকে শুরু করে মেরামতের খরচ সবই যায় তার ব্যক্তিগত খাত থেকে। মাসিক অফিস খরচ হিসেবে মাত্র ১৫ টাকা বরাদ্দ মেলে, যা দিয়ে কিনতে হয় প্রয়োজনীয় কলম বা কাগজ। সরকারি সহায়তা পেলে এই মাটির ঘরটি শুধু একটি ডাকঘর নয়, হতে পারে দেশের ডাকসেবার ইতিহাসের এক জীবন্ত নিদর্শন।’

ডাক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে আনোয়ারা উপজেলায় ১৩টি বিভিন্ন ডাকঘর ও উপ-ডাকঘরকে ‘ই-পোস্ট সেন্টার’ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে শুরু থেকে এ পর্যন্ত একটিতেও সেবা কার্যক্রম চোখে পড়েনি। ডাক বিভাগ প্রকল্পটি চালু আছে দাবি করলেও উপজেলা ডাকঘর ছাড়া অন্য কোনো ডাকঘরে নেই কম্পিউটার-ইন্টারনেটসহ আনুসঙ্গিক যন্ত্রপাতি। নেই তেমন জনবলও।

জানতে চাইলে উপজেলা পোস্টমাস্টার ছৈয়দুল কায়ছার বলেন, ‘আমি এ বছরই এখানে যোগদান করেছি। যার কারণে এসব বিষয়ে আমি মোটেও অবগত নই।’

পটিয়া উপ-বিভাগের পোস্ট অফিস পরিদর্শক রাজিব দাশ বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী কম্পিউটার, ইন্টারনেট, প্রিন্টারসহ প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রযুক্তি ডিভাইস অবশ্যই আছে। কিন্তু এসব যন্ত্রপাতি এখন নষ্ট হয়ে গেছে।’

ভবন নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি মূলত বরাদ্দনির্ভর বিষয়। তবে রাস্তার পাশে তিন শতক জমিদাতা পাওয়া সাপেক্ষে ডাক বিভাগে ভবন নির্মাণের প্রস্তাব রাখা যেতে পারে।