বিকেলের রোদ জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছে। বারান্দায় বসে দাদু কী যেন ভাবছেন। তখনই নাতি রিদয় দৌড়ে এসে তার পাশে বসে। বলে, ‘দাদু, তোমরা ছোটবেলায় মোবাইল ছিল না, টিভিও ছিল না। তাহলে সারা দিন কী করতে?’
দাদু হেসে বলেন, ‘আমাদের দিনগুলো ছিল কাজ, খেলা আর আনন্দে ভরা। শুনবে সেই গ্রামের গল্প?’
রিদয়ের চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে। বলে, ‘শুনব, দাদু! তোমার জীবনের গল্প শুনব।’
দাদু বলতে শুরু করেন
‘আমি তখন তোমার চেয়ে একটু বড়। গারো পাহাড়ের পাদদেশে আমাদের সেই গোবিন্দপুর গ্রাম। গ্রামের বাড়িতে ছিল আট-দশটি গরু। সন্ধ্যা হলেই খড় দিয়ে বানানো লম্বা বেণিতে আগুন ধরিয়ে গোয়ালঘরে ধোঁয়া দিতাম। ধোঁয়ায় মশা পালিয়ে যেত। গরুগুলোও নিশ্চিন্তে রাত কাটাত।’
রিদয় অবাক হয়ে বলে, ‘মশা তাড়ানোর জন্য তখন কয়েল ছিল না?’
না ভাই। গ্রামের মানুষ নিজেরাই বুদ্ধি খাটিয়ে নানা উপায় বের করত। তখন খড়ের ধোঁয়াই ছিল সবচেয়ে সহজ ব্যবস্থা।
দাদু একটু হেসে আবার বলেন, ‘ভোর হওয়ার আগেই মা আমাকে ডাকতেন। ঘুম চোখে উঠেই মুখ ধুয়ে গোয়ালঘরে যেতাম। এতগুলো গরুর মধ্যে কমপক্ষে একটি দুধেল গাভী তো সবসময় ছিল। হাতে মাটির একটি পাত্র নিয়ে গাভীর কাছে যেতাম। গ্রামের ভাষায় সেটাকে দোনা বলা হতো। সেটা দুই হাঁটুর মাঝখানে রেখে দুই হাতে ধীরে ধীরে গরুর দুধ দোহাতাম।’
ভয় লাগত না?
প্রথম প্রথম লাগত। পরে গরুগুলো যেন আমার বন্ধু হয়ে উঠেছিল। ওরা আমাকে চিনত। আমি আদর করলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকত।
রিদয় মন দিয়ে দাদুর গল্প শুনতে থাকে। তিনি আবার বলেন, ‘সকালের নাশতা খেয়ে বাবার সঙ্গে মাঠে যেতাম। লাঙ্গল, জোয়াল আর গরু নিয়ে যখন গ্রামের পথ ধরে হাঁটতাম। তখন চারদিকে থাকত কেবল সবুজ ধানের ক্ষেত। সবুজ ফসলে উথলে ওঠা মাঠ। বাতাস যখন ক্ষেতে ক্ষেতে ঢেউ খেলানো ক্রীড়ায় মেতে থাকত, মনটা তখন আনন্দে নেচে উঠত। শরতের শেষ দিকে শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে কী যে ভালো লাগত!’
রিদয় বলে, ‘তুমিও কি জমি চাষ করতে পারতে?’
অবশ্যই। বাবা লাঙ্গল ধরে আমাকে হালচাষ শিখিয়েছেন। কখনো কখনো লাঙ্গলও ধরতে দিতেন। এভাবে কাজ করতে করতে ঘেমে যেতাম, কিন্তু কষ্ট বলে কিছু মনে হতো না।
দাদুর চোখে যেন তখন পুরনো দিনের ছবি ভেসে ওঠে। তিনি বলতে থাকেন, ‘বর্ষায় চাষের মাঠে অনেক কৃষক কাজ করতেন। কেউ গল্প করতেন, কেউ আবার কাজের ফাঁকে উচ্চসুরে গান ধরতেন। একজন গান ধরলে অন্যরাও সুর মিলিয়ে গাইতেন। তাতে চারদিকে যেন উৎসবের আবহ তৈরি হতো।’
রিদয় মুগ্ধ হয়ে বলে, ‘তোমাদের মাঠটা নিশ্চয়ই খুব সুন্দর ছিল!’
হ্যাঁ, খুবই সুন্দর। বর্ষাকালে মাঠের পাশে নদী ভরে উঠত ঢলের জলে। সাদা বক উড়ে বেড়াত। খালের পানিতে ছোট ছোট মাছ লাফাত। আমরা কাজ শেষে নদীর পাড়ে বসে গল্প করতাম।
তখন কি তোমরা খেলা করতে?
অবশ্যই। শুকনো মৌসুমে বিকেল হলে বন্ধুদের নিয়ে গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, কাবাডি, লাঠিম, ডাংগুলি কত কী খেলতাম! কেউ আমাদের খেলতে ডাকতে আসত না। নিজেরা সবাই এক জায়গায় জড়ো হতাম।
রিদয় একটু চুপ করে থাকার পর বলে, আচ্ছা দাদু! মাঠের চাষাবাদে তোমাদের তো অনেক কষ্ট হতো। তবু তুমি বারবার বলছ, তখন খুব আনন্দ ছিল।
দাদু মৃদু হেসে বলেন, ‘কাজের সঙ্গে আনন্দ থাকলে কষ্টও হালকা লাগে। সবাই একে অন্যকে সাহায্য করত। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিত। তাই গ্রামের জীবন ছিল সহজ।’
দুই
কয়েক দিন পর রিদয় দাদুর সঙ্গে গারো পাহাড়ের পাদদেশে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যায়। সকালে ঘুম ভাঙলেই সে বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে উত্তরে গারো পাহাড়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। তখন দূরের মাঠে একটি ট্রাক্টর গর্জন করতে করতে রবিশস্যের জমি চাষ করছে।
রিদয় দাদুর হাত ধরে বলে, ‘তুমি তো বলেছিলে গরু দিয়ে চাষ করতে।’
দাদু হেসে বলেন, ‘সময় বদলে গেছে। এখন ট্রাক্টর অনেক কাজ সহজ করে দিচ্ছে। আগের মতো সারা দিন লাঙ্গল চালাতে হয় না।’
রিদয় মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে। দাদু তাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো গোয়ালঘরের কাছে গেল। সেখানে এখন আর খড়ের ধোঁয়া দেওয়া হয় না। মশা তাড়ানোর জন্য অন্য ব্যবস্থা আছে।
রিদয় বলল, ‘সবই তো বদলে গেছে! আগের মতো অত গরুও তো নাই।’
দাদু মাথা নেড়ে বলেন, ‘হ্যাঁ, অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু সব বদলায়নি।’
কী বদলায়নি?
মাটির গন্ধ, ভোরের শিশির, পাখির গান, নদীর হাওয়া আর মানুষের ভালোবাসা। এগুলো আজও আগের মতোই আছে।
তখন পাশের বাড়ির একজন কৃষক গরুর জন্য ঘাস কাটছিলেন। রিদয় দৌড়ে গিয়ে কাছে থেকে ঘাস কাটার দৃশ্য দেখল।
দাদু হাসিমুখে বলেন, ‘দেখেছ এভাবে ঘাস কেটে গরুকে খাওয়ায়। গরুর প্রতি ভালোবাসার ভাষা বদলায় না। মানুষ যদি প্রাণীদের যত্ন নেয়, প্রকৃতিও তাকে ভালোবাসে।’
শরতের সন্ধ্যায় উঠানে বসে আকাশভরা তারা দেখছিল দাদু আর নাতি। রিদয় ধীরে ধীরে বলল, ‘দাদু, আমি শহরে ফিরে গিয়ে তোমাদের গ্রামের গল্প বলব বন্ধুদের। তারা জানতে পারবে, গরু শুধু দুধই দেয় না, কৃষকের বন্ধুও। মাঠ শুধু ফসল ফলায় না, মানুষকে পরিশ্রম আর ভালোবাসাও শেখায়।’
নাতির কথা দাদুর মুখে হাসি ফুটে। তিনি নাতির মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘এই কথাটাই মনে রেখ, ভাই। তোমরা বড় হয়ে নতুন যন্ত্র ব্যবহার করবে, নতুন জ্ঞান অর্জন করবে, কিন্তু নিজের শিকড়কে কখনো ভুলে যেও না। যে মানুষ তার মাটি আর অতীতকে ভালোবাসে, সে-ই সত্যিকারের বড় মানুষ হয়।’
রিদয় আকাশের দিকে তাকায়। রাতের নরম বাতাসে ভেসে আসে মাটির গন্ধ। তার মনে হয় সবুজ মাঠে, কৃষকের ঘামে, গরুর শান্ত চোখে আর মানুষের ভালোবাসায় দাদুর কৈশোরের সেই গ্রাম যেন এখনো বেঁচে আছে। সেই গ্রামের গল্প শুধু দাদুর নয়; এদেশের হাজারো গ্রামের, হাজারো মানুষের শিকড়ের গল্প।