ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পদুয়া জমিদারবাড়ি

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নে তেওয়ারীহাট সংলগ্ন এলাকায় কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে পদুয়া গুপ্ত জমিদারবাড়ি। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো জমিদারবাড়িটি এখন ধ্বংসের পথে। প্রায় ১০০ কক্ষ বিশিষ্ট বাড়িটি দুই ভাগে বিভক্ত। একটি অন্দর মহল যেখানে পরিবার নিয়ে জমিদারবাড়ির বংশধররা বসবাস করতেন এবং অপরটি হলো কাচারিঘর যেখানে জমিদাররা বিচার ও খাজনা আদায়ের জন্য ব্যবহার করতেন। অপূর্ব নির্মাণশৈলীর জমিদারবাড়িটি বর্তমানে এক রকম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৭৮০ সালের দিকে ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রামে এসে লোহাগাড়ার পদুয়ায় বসতি গড়েন রামমোহন গুপ্ত। আরাকান রাজ্যের অধীনে স্থানীয় মগ ও চাকমাদের সঙ্গে বাঙালিদের সংঘাত রুখে দিয়ে তিনি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হন। পরে মাটির নিচে গুপ্তধন পেয়ে তিনি ইট, সুরকি ও কাঠের বিম দিয়ে এই জমিদারবাড়ি বা ‘রাজবাড়ি’ প্রতিষ্ঠা করেন।

জনশ্রুতি আছে, জমিদার কৃষ্ণ গুপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাড়ির কাঠ আনার সুবিধার্থে ‘কৃষ্ণ খাল’ খনন করেন। এছাড়া পানীয় জলের জন্য ২২ দশমিক ৪৩ একরের বিশাল ‘ঠাকুর দিঘি’, পদুয়ার দিঘি এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠ এই জমিদারবাড়ির অন্যতম অবদান।

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, বাড়িটির চারপাশে বড় বড় পুকুর ও দিঘি। বাড়ির পুরনো দেয়ালে বড় বড় বটের চারা, ভাঙা দরজা-জানালা। মূল ভবন থেকে খসে পড়ছে ইট। তবে ১৯৪৮ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে এ বাড়ির দুর্দশা শুরু হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ বাড়িতে টানা ৪০ দিন লুটপাট চলে বলে জানা যায়। ওই সময় জমিদারবাড়ির অনেক পুরাকীর্তি ও মূল্যবান জিনিসপত্র স্থানীয় রাজাকাররা চুরি করে নিয়ে যায় এবং বাড়ির ভেতরে আগুন লাগিয়ে দেয়। বর্তমানে এ বাড়ির পুরনো ম-পে ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। জমিদার এলাকায় প্রচুর মন্দির, মসজিদ ও পাঠশালা স্থাপনে সার্বিক সহযোগিতা করেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন পদুয়ার ঐতিহ্যবাহী বাজার তেওয়ারীহাট। যে বাজারের সুনাম পুরো চট্টগ্রামে রয়েছে। জানা যায়, চট্টগ্রাম শহর, বান্দরবান, চকরিয়াসহ ভারতেও এ বাড়ির বিপুল ভূ-সম্পত্তি রয়েছে।

জমিদারবাড়ির নিকটাত্মীয় প্রবীণ প্রধান শিক্ষক সুনীল চৌধুরী বলেন, ১৭০০ সালের শেষের দিকে জমিদারি কার্যক্রম শুরুর পরেই হয়তো এ জমিদারবাড়িটি নির্মাণ করা হয়। এটি একটি অপূর্ব প্রাচীন নিদর্শন। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে বাড়িটি দেখার জন্য দর্শনার্থীরা আসেন। সরকারের প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ বাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি প্রাচীন নিদর্শন দেখতে পেত। তা নাহলে অচিরেই হারিয়ে যাবে এ সুন্দর স্থাপত্য।

লোহাগাড়ার মোস্তাফিজুর রহমান কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. ইলিয়াছ বলেন, লোহাগাড়া উপজেলার একমাত্র শত বছরের পুরনো ভবন পদুয়া জমিদারবাড়ি। সরকারিভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নিলে অপূর্ব নিদর্শনটি রক্ষা পেত। এটি একটি পর্যটন স্পটে পরিণত হতো।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজিদ বিন আখন্দ বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় বর্তমান সরকার যথেষ্ট আন্তরিক। পদুয়ার জমিদারবাড়িটি লোহাগাড়া তথা চট্টগ্রামের একটি প্রাচীন ইতিহাস। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে এ বাড়িটি সংরক্ষণ করা যায় সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।