চমেকের মনোরোগ বিভাগ চলছে জোড়াতালি দিয়ে

বিছানায় ছটফট করছেন ২৭ বছর বয়সী তরুণ শেফায়েত (ছদ্মনাম)। বাইপোলার ডিসঅর্ডারের তীব্রতায় তাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বৃদ্ধ বাবা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে হঠাৎ করে শেফায়েত ক্ষিপ্ত হয়ে রুম থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করতেই চারদিকে হুড়াহুড়ি পড়ে যায়। ওয়ার্ডে কোনো নিরাপত্তারক্ষী না থাকায় নার্স ও বৃদ্ধ বাবাই অনেক কষ্টে টেনেটুনে তাকে ভেতরে ফিরিয়ে আনেন। একদিকে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা, অন্যদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পাওয়া গেল না কোনো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট; চিকিৎসকের পরামর্শে এগিয়ে এলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ইন্টার্নশিপ করতে আসা এক শিক্ষার্থী।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কোটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের একমাত্র ভরসাস্থল চমেকের এই মনোরোগবিদ্যা বিভাগ। তবে প্রতিনিয়ত যেখানে শেফায়েতের মতো জটিল রোগীরা আসছেন, সেখানে অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও জনবলের চিত্র চরম হতাশাজনক। তিন বছর ধরে শূন্য অধ্যাপকের পদ। নেই কোনো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট কিংবা নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্য। প্রশিক্ষিত সাইকোলজিস্টের হাত ধরে যে থেরাপি পাওয়ার কথা, তা সামলাতে হচ্ছে ইন্টার্নদের, আর নিরাপত্তার অভাবে ডাক্তার-নার্সদেরই পাহারা দিতে হচ্ছে রোগীদের।

পাহারা নেই, পালিয়ে যান রোগীরা : বিশেষায়িত এই মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে নিরাপত্তাহীনতা এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। পুরো ওয়ার্ডে কোনো আনসার সদস্য মোতায়েন নেই। মানসিক ভারসাম্যহীন কিংবা তীব্র উত্তেজনায় থাকা রোগীরা প্রায়ই ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে বাইরে চলে যান। তখন অভিভাবক, নার্স বা চিকিৎসকদেরই বেরিয়ে রোগীদের খুঁজে আনতে হয়। অঘটন এড়াতে ও রোগীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাধ্য হয়ে প্রতিটি ভর্তি রোগীর সঙ্গে পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকতে হচ্ছে। আইসোলেশন রুমে গুরুতর রোগীদের হাত-পা বেঁধে চিকিৎসা দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না। চিকিৎসকরা বলছেন, স্পর্শকাতর এই ওয়ার্ডে তিন শিফটে অন্তত তিনজন আনসার জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন। না হলে যেকোনো সময় রোগীরা যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারেন।

সৃজনের ৩ বছরেও অধ্যাপক পায়নি বিভাগ, চবির ইন্টার্নদের কাঁধে থেরাপি : হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিভাগে চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে ২০২৩ সালে অধ্যাপকের একটি পদ সৃজন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছরেও সেই পদে কাউকে পদায়ন করা হয়নি। বর্তমানে দুইজন সহযোগী অধ্যাপকের জায়গায় বিভাগ সামলাচ্ছেন একজন সহযোগী অধ্যাপক। মেডিকেল অফিসারদের ছয়টি অনুমোদিত পদের তিনটিই খালি।

সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে ‘ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট’ না থাকায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিজোফ্রেনিয়া বা বাইপোলারের মতো জটিল রোগে ওষুধের প্রয়োজন হলেও কনভার্সন ডিজঅর্ডার, ওসিডি ও তীব্র দুশ্চিন্তার (অ্যাংজাইটি) মতো রোগে থেরাপিই প্রধান চিকিৎসা। এই হাসপাতালে অন্তত সাতজন স্থায়ী সাইকোলজিস্ট প্রয়োজন হলেও রয়েছেন মাত্র একজন। ফলে চবির মনোবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপের অংশ হিসেবে এসে সাময়িকভাবে কাউন্সেলিংয়ের কাজ চালাচ্ছেন। তারা ইন্টার্নশিপ শেষ করে চলে যাওয়ার পর চিকিৎসকদেরই থেরাপি দিতে হয়।

ছয় বছরে রোগী বেড়েছে তিনগুণ : বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় বছরে চমেকের মনোরোগ বিভাগে রোগীর চাপ বেড়েছে অকল্পনীয় হারে। ২০২০ সালে বহির্বিভাগে সেবা পেয়েছিলেন ১০ হাজার ৮১৫ জন রোগী, যা ছয় বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজারে, যা আড়াই গুণের বেশি। একই সময়ে ইনডোরে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩২৬ জন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৮ জনে, যা আগের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি। চমেকের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের তথ্যমতে, গত বছর ২০২৫ সালে মানসিক রোগে আক্রান্ত ১ হাজার ৬৮ জন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। যাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৩৮ জন বাইপোলার-১ এবং ২১৯ জন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। মোট ৪৫৭ জন বা ৪২ দশমিক ৭৯ শতাংশ রোগী এই দুই রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া কনভার্সন ডিজঅর্ডারে ১৬৪ জন, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে বাইপোলার ডিজঅর্ডারে ৭৯ জন এবং সাবস্ট্যান্স ইউজ ডিজঅর্ডারে ৭৮ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। ব্রিফ সাইকোটিক ডিজঅর্ডারে ৪১ জন, নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারে ২৫ জন, অপজিশনাল ডিফায়েন্ট ও কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারে ২৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

জনবলের চরম অভাব : এদিকে পুরো বিভাগে পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য সরকারি অনুমোদিত ২৩টি বেডের বিপরীতে বাধ্য হয়ে ৬০টি বেড চালাতে হচ্ছে। অথচ বিশাল এই ইনডোর ও আউটডোর সামলাতে ওয়ার্ড বয় আছেন মাত্র ৩ জন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবে অনেক সময় চিকিৎসকরা নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে ওয়ার্ড পরিষ্কার রাখছেন। বিশেষায়িত এই ওয়ার্ডে প্রশিক্ষিত সাইকিয়াট্রিক নার্স নেই। নার্স আছেন ১২ জন, যাদের প্রতি ৩ থেকে ৬ মাস পরপর বদলি করা হয়।

ফলে নতুন নার্স এলে মানসিক রোগী ব্যবস্থাপনার কৌশল তাদের আবার নতুন করে শেখাতে হয়। এ বিষয়ে চমেকের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. পঞ্চানন আচার্য বলেন, অন্যান্য বিভাগের তুলনায় আমাদের বিভাগে জনবল ও নিরাপত্তা সংকট সবচেয়ে তীব্র। দ্রুত চিকিৎসক ও অভিজ্ঞ নার্স নিয়োগ দেওয়া দরকার। বিশেষ করে থেরাপির জন্য স্থায়ী ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নিয়োগ এবং নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্য মোতায়েন করা অত্যন্ত জরুরি।

সার্বিক বিষয়ে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, হাসপাতালে ওয়ার্ডের সংখ্যা ৪৮। কিন্তু পুরো হাসপাতালে আনসার আছেন মাত্র ১০০ জন। স্বল্পসংখ্যক এই জনবল দিয়ে তিনটা শিফট চালাতে হচ্ছে। বিশেষায়িত এই ওয়ার্ডে নিরাপত্তা জোরদারে আনসার সদস্য নিয়োগসহ সার্বিক সংকট নিরসনে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।