সাদা বলের ক্রিকেটে চার-ছক্কার অবলীলাক্রম প্রদর্শন আর ব্যাটারদের তাণ্ডবে চারপাশের উৎসবের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে বোলারদের অস্তিত্ব। রাঁচির রানবন্যার রাতে ২৫০ রানের বিশাল পাহাড় গড়ার পরও দলকে জয় উপহার দিতে পারেননি ভারতীয় বোলাররা।
ফ্ল্যাট পিচ আর শিশিরে ভেজা কন্ডিশনে বোলারদের এভাবে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে দেখে আর চুপ থাকতে পারেননি প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর। তার মতে, আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে পিচের এমন একমুখী আচরণ কেবল খেলাটির ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, বরং উদীয়মান বোলারদের ভবিষ্যৎকেও বড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
রাঁচিতে ম্যাচ শেষে দুই দল মিলে তুলেছে ৫০১ রান, আর ৩৮.৩ ওভারেই গ্যালারিতে আছড়ে পড়েছে ৩৩টি ছক্কা। এমন ধুন্ধুমার লড়াই শেষে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে এসে বোলারদের সুরক্ষা ও উইকেটে সমতা আনার জোরালো দাবি তোলেন ভারতের এই সফল কোচ।
একতরফা ব্যাটিংবান্ধব পিচের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে গম্ভীর বলেন, ‘আপনি কি ব্যাট ও বলের মধ্যে সমমানের প্রতিযোগিতা দেখতে চান না? আমরাও তো সেটাই দেখতে চাই। এই বোলাররা আমাদেরই সদস্য, অন্য কারও নয়। এমন পরিস্থিতিতে তাদের ক্যারিয়ারই আজ হুমকির মুখে। ড্রেসিংরুমে স্থান করে নিতে তারা অমানসিক পরিশ্রম করেছে। লড়াইটা যদি সমানে সমানে না হয়, তবে ক্রিকেটের আসল নান্দনিকতা বজায় থাকবে কীভাবে?’
বিশাল লক্ষ্য বেঁধে দিয়েও পরাজয়ের তেতো স্বাদ সহজে হজম করার বিষয় নয়। তবে পিচের বৈরিতাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় না করিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের হেড কোচ হিসেবে নিজের দলের ভুলত্রুটিগুলো শোধরানোর ওপরই বেশি জোর দিচ্ছেন গম্ভীর।
নিজেদের ঘাটতিগুলো ধামাচাপা না দিয়ে নতুন করে শেখার মানসিকতা প্রকাশ করে গম্ভীর আরও যোগ করেন, ‘যেকোনো পরাজয়ই কষ্টের, একে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আপনি যদি দিনে দিনে নিজেকে আরও উন্নত করতে চান, তবে কোনো ত্রুটিই কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখা যাবে না। আমরা বিশ্বসেরা দল, তাই প্রতিনিয়ত নিজেদের ঝালাই করাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা জানি ভিজে যাওয়া নির্জীব পিচে বল করা কতটা কঠিন, তবুও সেখান থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যায়, সেই সমাধান আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।’
অথচ ম্যাচের শুরুটা অন্যরকম হতে পারতো। গতিদানব মায়াঙ্ক যাদবের আগুনের গোলা সামলাতে না পেরে প্রথম ওভারেই দুই উইকেট এবং পাওয়ারপ্লে শেষ হওয়ার আগেই তিন উইকেট হারিয়ে বসেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের গতিপথ যে কেবল প্রথম কয়েকটি বলেই নির্ধারিত হয় না, তা খুব ভালো করেই জানেন গম্ভীর।
শুরুর ঝড়ের পর প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সামর্থ্যকে সম্মান জানিয়ে গম্ভীর বলেন, ‘আমি পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলেছি এটা বুঝতে যে, খেলা কখনোই কেবল প্রথম ওভারে মীমাংসা হয়ে যায় না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে চরম বিপজ্জনক এক দল এবং আমরা তাদের সেই শক্তিকে শ্রদ্ধা করি। পুরো ৪০ ওভারজুড়ে নিয়মিত ভালো খেললেই তবে কোনো দলের পক্ষে জয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব।’
সেই শুরুর ধাক্কা সামলে ক্যারিবীয়দের জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন শাই হোপ ও শেরফেন রাদারফোর্ড। ৪৫ বলে ১০২ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলা হোপকে প্রশংসায় ভাসাতে কার্পণ্য করেননি ভারতের সাবেক এই বিশ্বজয়ী ব্যাটার। ‘শাই একজন বিশ্বমানের ক্রিকেটার। সাদা বলের ক্রিকেটে ও যা অর্জন করেছে, তার জন্য ওর প্রতি আমাদের পূর্ণ সম্মান রয়েছে। ইনিংসের শুরুতেই দুই সতীর্থকে হারিয়েও শেরফেনকে সঙ্গে নিয়ে যেভাবে ১২-এর ওপর রানরেট ধরে রেখে ম্যাচ শেষ করে এলো,তাতেই পরিষ্কার হয় এমন ফ্ল্যাট উইকেটে ওরা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।’
এদিকে ম্যাচের মাঝপথে ব্যাটিং অর্ডারে রদবদল এনে শিবম দুবেকে চার নম্বরে প্রমোট করা নিয়ে সমালোচকদের তোপের মুখে পড়তে হলেও নিজের পরিকল্পনা থেকে একচুলও সরছেন না গম্ভীর।
দলের ব্যাটিং অর্ডারের নমনীয়তা বা ফ্লেক্সিবিলিটি বজায় রাখার পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি পরিষ্কার জানান, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে সব দিন একরকম যাবে না। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে কেবল ওপেনারদের স্থান নির্দিষ্ট, বাকি সব পজিশনেই আমরা পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন আনব। মূল বিষয় হলো আমরা ২৫০ রান নিয়েও জয় ধরে রাখতে পারিনি। প্রতিপক্ষ চমৎকার খেলে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে, তাদের এই কৃতিত্ব দিতেই হবে।’
পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ এখন ১-১ সমতায়। ইন্দোরে সিরিজের পরের ম্যাচটি হবে আগামীকাল রবিবারে।