দারুণ সাহসী ও নিরীক্ষাপ্রিয় লেখক অ্যান কারসন। কোন ধরনের লেখা লেখেন তিনি? কবিতা? উপন্যাস? নাটক? বিস্ময়কর হলো, এই ধরনের প্রথাগত রচনার বা জনরার লেখক নন তিনি। কারসন লেখেন একেবারে ভিন্ন ধরনের লেখা, সবকিছু একেবারে মিশিয়ে দেন। কবিতার সঙ্গে থাকে কাহিনি; প্রবন্ধের মধ্যে ঢুকে পড়ে কবিতা, গদ্যের মধ্যে পদ্য। একেবারে ওলটপালট করে ফেলেন লেখাকে। প্রচলিত অর্থে তাই তাকে কবি বলা যাবে না, ঔপন্যাসিকও বলা যাবে না, অনুবাদকও নন তিনি।
তিনি প্রচুর অনুবাদ করেছেন। সাফো থেকে গ্রিক নাটক, কিছুই বাদ যায়নি। এই অনুবাদেও আছে নিরীক্ষা। তিনি পুরাণকে ভেঙে সমকালের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার সব রচনাই ভীষণ গভীর। পাঠক পুরোপুরি হারিয়ে যাবেন তার রচিত অন্যরকম কল্পজগতে। ঠিক এই বিষয়টিকেই স্বীকৃতি দিয়েছে নোবেল পুরস্কার কমিটি। তারা প্রশংসা করেছেন তার ‘সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের জন্য।’ যথার্থই বলেছে নোবেল কমিটি, ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে এক চমৎকার আলাপচারিতার মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যের একেবারে একটা নতুন রূপ তৈরি করেছেন তিনি। এই রূপটি তার একেবারে নিজস্ব। এককথায় বললে, কী বিষয়-আশয়, কী রচনাশৈলী তার লেখা হচ্ছে একধরনের মিশ্র রচনা। সেই রচনার নির্দিষ্ট কোনো নাম দেওয়া সত্যি কঠিন। তবে সেই কল্পজগতে বিচরণ করতে বেশ লাগে।
তার প্রথম প্রকাশিত বই ইরোস দ্য বিটারসুইট। এই বইতে সাহিত্য সমালোচনামূলক লেখার পাশাপাশি অবলীলায় বিচরণ করেছেন প্রাচীন গ্রিক জগতে এবং পৌরাণিক কাহিনির মধ্য দিয়ে সমকালের চৈতন্যকে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য আরেকটি গ্রন্থ ইকোনমি অব দ্য আনলস্ট। এই বইটি লেখা হয়েছে কারসনের তুলনামূলক সাহিত্যচিন্তা ও নশ্বরতার দর্শনের ওপর নির্ভর করে।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের প্রাচীন গ্রিক গীতিকবি সিমোনিদেস অব কেওস এবং বিশ শতকের জার্মান হলোকাস্টের কবি পল সেলানের কাব্যদর্শনকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন তিনি। সময়কালের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের বিশাল ব্যবধান সত্ত্বেও কীভাবে দুই ভিন্ন যুগের কবি ভাষার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য, ক্ষয়প্রাপ্তি এবং স্মৃতিকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে একই সূত্রে গ্রথিত হন—বইটিতে তা অত্যন্ত গভীর ও স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
কারসনের জনপ্রিয় বই অটোগ্রাফি অব রেড। এটি এমন একটি আধুনিক সাহিত্যকীর্তি, যা গ্রিক পুরাণ, আধুনিক কবিতা এবং উপন্যাসের সংমিশ্রণে রচিত। বইটি ধ্রুপদী গ্রিক সাহিত্যকে সমকালীন যুগের আলোয় নতুনভাবে উপস্থাপন করার জন্য আন্তর্জাতিক সাহিত্য জগতে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। প্রথাগত গদ্য উপন্যাস নয় এটি। কবিতার ছন্দে তিনি উপন্যাস লিখেছেন, অর্থাৎ কাব্যোপন্যাস। পৌরাণিক গল্পকে আধুনিক কবিতার ছাঁচে ফেলে কারসন এতে মানুষের ভেতরের একাকিত্ব ও সৌন্দর্যকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন।
২০১৪ সালে প্রকাশিত তার গুরুত্বপূর্ণ রচনা দ্য অ্যালবার্টিন ওয়ার্ক-আউট। এটি সাহিত্য সমালোচনা এবং দর্শনের এক অনন্য সংমিশ্রণ। বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের মহাকাব্যিক উপন্যাস ইন সার্চ অব লস্ট টাইম-এর একটি প্রধান নারী চরিত্র অ্যালবার্টিনকে কেন্দ্র করে কারসন এই গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ-গ্রন্থটি রচনা করেছেন। তবে তা শুধু মার্সেল প্রুস্তের রচনার একটি পাঠ উন্মোচন নয়, বরং এটি প্রেম, হিংসা, স্বাধীনতা এবং মানুষের মনের অধরা প্রকৃতি সম্পর্কিত গভীর সৃষ্টিশীল অনুসন্ধান।
আরেকটি বইয়ের কথা বলি—ইফ নট উইন্টার বইটির নাম। গ্রিক কবি সাফোর কবিতার খণ্ডবিখণ্ড টেক্সটকে আধুনিক পাঠকের কাছে নতুন আলোয় উপস্থাপন করেছেন কবি, ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত ও অনুবাদক অ্যান কারসন। সাফোকে কেন্দ্র করে অনুবাদ-সাহিত্যের এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছেন তিনি। অনুবাদের ক্ষেত্রে এই কাজটির তাৎপর্য পশ্চিমাবিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। নারী-মনস্তত্ত্ব ও স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটেছে এই অনুবাদে। সাফোর লেখায় যে নারী-অভিজ্ঞতা ও প্রেমচেতনা প্রকাশিত হয়েছে, কারসনের নিরপেক্ষ ও প্রাঞ্জল অনুবাদে তা কোনো পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ছাঁকনি ছাড়াই সরাসরি পাঠকের কাছে পৌঁছেছে।
কারসনের আরেকটি মিশ্র রচনা ডিক্রিয়েশন। বহুমুখী এই গ্রন্থে কার্সন কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং অপেরার মিশেলে মানবসত্তার একটি গভীর রূপান্তরকে উন্মোচন করেছেন। তিনি ‘ডিক্রিয়েশন’ শব্দটিকে মূলত ফরাসি দার্শনিক ও রহস্যবাদী সিমন ভেলের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে নিয়েছেন। সাধারণ ভাষায় ডিক্রিয়েশন হলো—অহং বা স্বত্বাকে মুছে ফেলে চরম পরমার্থিক বা ঐশ্বরিক সত্তার সঙ্গে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার অনুশীলন। এই বইটিও ভীষণ সমাদৃত হয়। সাফো নামেও একটি বই লিখেছেন তিনি। প্রাচীন গ্রিক কবি সাফো, যিনি কামপ্রবৃত্তি বা পার্থিব ভালোবাসার চরম মুহূর্তে স্বত্বা হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। কারসনের জার্নিটাও এ রকমই। বইটির ফর্ম বা রূপকল্পেও ‘ডিক্রিয়েশন’ প্রক্রিয়াটি প্রয়োগ করেছেন কারসন। বইটি কোনো নির্দিষ্ট প্রকরণে আবদ্ধ নয়। কবিতায় এখানে রয়েছে ব্যক্তিমানুষের বিরহ ও শূন্যতার চিত্র। নাটক ও অপেরায় রয়েছে ‘লট-এর স্ত্রী’ কিংবা প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডির চরিত্রদের নিয়ে লেখা সংলাপ। ভীষণ অভিনব কিন্তু হৃদয়গ্রাহী এই বই।
আরেকটি বই নিয়ে বলি। বইটির নাম ইরোস দ্য বিটারসুইট। এতে তিনি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, সাহিত্যতত্ত্ব এবং দর্শনের আলোকে প্রেমের বহুমাত্রিক প্রকৃতির চিত্র তুলে ধরেছেন। কারসনের এই ইরোস দ্য বিটারসুইট সাধারণ প্রেমের বই নয়; বরং এটি গ্রিক প্রেমকাব্য ও দর্শনের আলোকে মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও কামনার গঠন বোঝার অনন্য সৃষ্টিশীল রচনা।
অ্যান কার্সনের প্লেন ওয়াটার নামে আরেকটি মিশ্ররীতির বই আছে। বইটি মূলত গদ্য, পদ্য, ব্যাকরণ, ধ্রুপদী অনুবাদ এবং ভ্রমণকাহিনির একটি অসাধারণ মিশেলে রচিত। প্লেন ওয়াটার সাহিত্য ও রূপকের এক অনন্য সংমিশ্রণ।
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তার এই বহুমুখী রচনার সংকলনে তিনি ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যের কাঠামোকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছেন। এই বইতে তিনি কবিতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রবন্ধ, ধ্রুপদী গ্রিক সাহিত্যের বিশ্লেষণ এবং ভ্রমণ ডায়েরির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। ‘পানি’—যা একই সঙ্গে প্রবহমান, স্বচ্ছ, আবার অতল গভীর—একেই কারসন এই গ্রন্থের মূল রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। উঠে এসেছে জীবনপ্রবাহের আখ্যান।
পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কারসনের প্রতিটি বই বিশিষ্ট। গত কয়েক বছর ধরে বলা হচ্ছিল যে তিনি নোবেল পুরস্কার পাবেন। এবার সেই প্রতীক্ষার অবসান হলো। কারসনের পুরস্কারপ্রাপ্তিকে ইউরো-মার্কিন, এবং বাইরের পৃথিবীর পাঠকরা যোগ্য একজন লেখককেই নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলো বলে প্রশংসা করবেন, নির্দ্বিধায় বলা যায় এ কথা। তিনি প্রচলিত অর্থে কবি নন, ঔপন্যাসিক নন, অনুবাদক নন, এমনকি পণ্ডিত প্রাবন্ধিকও নন, কিন্তু আবার সবই। এ রকম সাহসী লেখক বিশ্বসাহিত্যে কখনো এসেছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। অভিনন্দন মার্কিন প্রবাসী কানাডীয় এই লেখককে।