মাধ্যমিকের কারিকুলামে ‘মনোবিদ্যা’ যুক্ত করার পরামর্শ

জিপিএ-৫ পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে, এমনকি পরীক্ষার হল ছেড়ে চলেও যেতে চাইছে। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শারীরিক শিক্ষার পাশাপাশি ‘মনোবিদ্যা’ বিষয়টি কারিকুলামে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। ‘জীবনের অভিজ্ঞতার কণ্ঠস্বর শুনি: বাস্তব কণ্ঠস্বর, বাস্তব পরিবর্তন’ প্রতিপাদ্যে চমেকের মনোরোগবিদ্যা বিভাগ এই বৈঠকের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. পঞ্চানন আচার্য্য।

বৈঠকে ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহেদা আক্তার বলেন, অভিভাবকেরা শিক্ষার্থীদের শেখার চেয়ে জিপিএ-৫ অর্জনে বেশি জোর দেন। এই অতিরিক্ত চাপ সামলাতে না পেরে শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। উল্টো অভিভাবকেরা কারণ না খুজেই আরও চাপ দেন। শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ নিশ্চিতে কারিকুলামে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মনোবিদ্যা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এছাড়া প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সঠিক কাউন্সেলিং নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়গুলোতে স্থায়ী কাউন্সিলরের পদ সৃষ্টির তাগিদ দেন শিক্ষকেরা।

বৈঠকে বক্তারা আফসোস প্রকাশ করে বলেন, সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যকে এখনো ‘ট্যাবু’ বা জীন-ভূতের আছড় বলে মনে করা হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ঝাড়ফুঁকের অপচিকিৎসার আশ্রয় নেওয়ায় সমস্যা আরও জটিল হয়। সমাজ ‘পাগল’ ভাববে, এমন ভুল ধারণার কারণে অনেকেই সমস্যা গোপন রাখেন।

অনুষ্ঠানে সিএমপির পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী তার বক্তব্যে পুলিশ সদস্যদের নানা মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। তিনি পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান ও চিকিৎসাপরামর্শ দিতে চমেকের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের প্রতি আহ্বান জানান। 

চসিকের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোয়েব উদ্দিন খান বিবাহবিচ্ছেদের কারণে তৈরি হওয়া মানসিক সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। এছাড়া অটিজম নিয়ে নিজের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা জানান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. বাসনা মুহুরী।

চমেকের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চিত্র তুলে ধরে বৈঠকে জানানো হয়, বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কোটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের একমাত্র ভরসাস্থল এই বিভাগে ৬০টি শয্যা থাকলেও চিকিৎসক, নার্স ও জনবলের চরম ঘাটতি রয়েছে। নেই কোনো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পদ।

বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চমেকের এই ওয়ার্ডে ১ হাজার ৬৮ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫৭ জন (৪২.৭৯ শতাংশ) বাইপোলার-১ ও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। এছাড়া কনভার্সন ডিসঅর্ডার, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা এবং মাদকাসক্তিজনিত মানসিক সমস্যায় ভুগে বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

গোলটেবিল বৈঠকে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জসিম উদ্দিন, চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. তসলিম উদ্দিন, সিএমপির পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোয়েব উদ্দিন খান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আনিসুল হোসেন, মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুস সাত্তার, শিশুরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. বেলায়েত হোসেন ঢালী, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বাসনা মুহুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আরিফুল ইসলাম, মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজনীন সরকার, চট্টগ্রাম কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হাসিব আল মাহমুদ। এছাড়াও গোল টেবিল বৈঠকে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষক, চিকিৎসক ও সাংবাদিক প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।