কৃষকের মাঠ থেকে মানুষের পাতে বিএডিসির ৬৫ বছরের অভিযাত্রা

একটি ধানের শীষের গল্প আসলে শুধু একটি শস্যের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি ভালো বীজের গল্প, সঠিক সময়ে সেচ পাওয়ার গল্প, প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার গল্প, কৃষকের নিরলস শ্রম এবং সর্বোপরি একটি জাতির খাদ্য নিরাপত্তার গল্প। ধানের শীষটি যখন কৃষকের মাঠে দুলতে থাকে, তখন তার পেছনে কাজ করে যায় বহু প্রতিষ্ঠানের নীরব প্রচেষ্টা। সেই নেপথ্যের অন্যতম কা-ারী হলো বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।

কাকতালীয়ভাবে নয়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের জন্ম হয়েছিল এক ঐতিহাসিক দিনে, ১৬ অক্টোবর ১৯৬১ সালে। জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব খাদ্য দিবসও ১৬ অক্টোবর। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও রক্ষার্থে বিএডিসির কার্যক্রম যেন একইসূত্রে গাঁথা। উদ্দেশ্য একই, শুধু পরিধি ভিন্ন। ১৬ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব খাদ্য দিবস। ফলে দিনটি বিএডিসির জন্য শুধু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন নয়; কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার বৃহত্তর অঙ্গীকার স্মরণ করারও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন।

১৯৬১ সালে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিএডিসি যাত্রা শুরু করে, ৬৫ বছরে এসে তা এখন বহুমাত্রিকতায় বিস্তৃত। বিএডিসি দেশের কৃষি উন্নয়নে একটি বহুমুখী সেবা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। সংস্থাটি মানসম্মত বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ, সেচ সুবিধা প্রদান ও সম্প্রসারণ, মানসম্মত সার আমদানি ও বিতরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। প্রতিষ্ঠার সময় দেশের কৃষি ছিল নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। উন্নতমানের বীজের স্বল্পতা, সেচের সীমিত সুযোগ, কৃষি উপকরণের অপ্রতুলতা কৃষি উৎপাদনের পথে বড় বাধা ছিল। সময়ের সাথে সাথে দেশের কৃষি চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিবর্তিত হয়েছে কৃষির ধরন, আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের কার্যক্রমকে সামঞ্জস্য করে কৃষকের পাশে থেকেছে বিএডিসি।

বীজে স্বনির্ভরতায় অন্যতম সহযাত্রী : ১৯৬২-৬৩ সালে বিএডিসি প্রায় ১৩.৮ মে. টন বীজ সরবরাহের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে। ক্রমান্বয়ে বিএডিসির বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ সালে বিএডিসি কর্তৃক ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পাট, ডাল, মসলা, সবজি ও তৈলবীজসহ বিভিন্ন ফসলের ১ দশমিক ৪৪ লাখ টন বীজ উৎপাদন এবং ১ দশমিক ৪৭ লাখ টন বীজ কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে। মানসম্মত বীজ ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম উপকরণ। উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে বিতরণের লক্ষ্যে বিএডিসির রয়েছে নিজস্ব ৩৪টি বীজ উৎপাদন খামার, ১০টি উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্র, ১৪টি অ্যাগ্রো সার্ভিস সেন্টার, ৯২টি চুক্তিবদ্ধ চাষি জোন, ৬৫টি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, ৩০টি আলুবীজ হিমাগার, আটটি টিস্যু কালচার ল্যাব এবং ১০০টি বীজ বিক্রয় কেন্দ্র। বিএডিসির বিভিন্ন চুক্তিবদ্ধ চাষি জোনে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৭৫ জন চুক্তিবদ্ধ চাষি রয়েছে, যারা বিএডিসির বীজ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন করে বিএডিসির নিকট তা সরবরাহ করে যাচ্ছে। গবেষণা সেলের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৪০টি উচ্চফলনশীল এবং সম্ভাবনাময় ফসলের জাত বিএডিসির নামে নিবন্ধন করা হয়েছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিকূলতাসহিষ্ণু তথা লবণাক্ত, খরা ও জলমগ্নসহিষ্ণু জাতের বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং সরবরাহের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সেচ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা : ১৯৬১-৬২ সালে ১৫৫৫টি শক্তিচালিত পাম্পের মাধ্যমে বিএডিসি কর্তৃক দেশে আধুনিক সেচ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে।  বর্তমানে পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি, ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানোর মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সেচ ব্যয় হ্রাসের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, খাল পুনঃখনন, ভূউপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, শক্তিচালিত পাম্প স্থাপন, গভীর নলকূপ পুনর্বাসন, পাহাড়ি এলাকায় ঝিরিবাঁধ নির্মাণ এবং সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প ও ডাগওয়েল স্থাপন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২২ হাজার হেক্টর জমি সেচ সুবিধা ও সেচ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আলোচ্য অর্থবছরে ৮২০ কিলোমিটার খাল খনন/পুনঃখনন, ৬৬২টি সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, ৪৯ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, ১৬১টি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন, ৫০টি পলিশেড নির্মাণ, ৪৭৮টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং এবং ১৩০ হেক্টর জলাবদ্ধতা দূরীকরণ করা হয়েছে।

সার ব্যবস্থাপনার সাফল্যে বিএডিসি : কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে বীজ ও সেচের পাশাপাশি সার ব্যবস্থাপনাও নিবিড়ভাবে জড়িত। কৃষি উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ সার। ১৯৬০-৬১ সাল থেকে বিএডিসি কৃষকদের নিকট সার বিক্রি, ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজ শুরু করে। ১৯৬২-৬৩ সালে প্রায় ৫০ হাজার টন সার কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়। বিএডিসির মাধ্যমে তখন থেকে সারাদেশে থানাভিত্তিক সার বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে সার বিপণন কার্যক্রম চালু করা হয়। বর্তমানে বিএডিসি কর্তৃক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি) নন-ইউরিয়া সার আমদানি করা হয়েছে ২৬ দশমিক ২৭ লাখ টন এবং সার বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ১ লাখ টন। উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারাদেশে বিএডিসি জাতীয় চাহিদার বিপরীতে ৭৫.৩৭% নন-ইউরিয়া সার সরবরাহ করেছে।

পলিশেডে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কৃষি : আধুনিক ও টেকসই কৃষিব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিএডিসি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে পলিশেড নির্মাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। সারাদেশে এ পর্যন্ত ৮২টি পলিশেড নির্মাণ করা হয়েছে এবং জুন ২০২৮-এর মধ্যে আরও ৬০টি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রচ- ঠা-া, অধিক তাপ কিংবা অতিবৃষ্টির মতো প্রতিকূল আবহাওয়াতেও পলিশেডে চারা উৎপাদন অব্যাহত থাকায় কৃষকের চারা উৎপাদন ঝুঁকি কমছে।

এ ছাড়া পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাংলাদেশ। দেশের ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃত্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের ব্যবহৃত পাট বীজের চাহিদা দেশের অভ্যন্তরেই উৎপাদনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণকল্পে বিএডিসির মাধ্যমে ৪ বছর মেয়াদি একটি সময়ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমানে ২০২৬-২৭ উৎপাদন মৌসুমে ২২১০.০০ মে. টন বীজ উৎপাদনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজবীজ উৎপাদনে কৃষকদের নিকট গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বীজ সরবরাহের ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা সম্পূর্ণভাবে কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার কর্তৃক দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদনে অত্যাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

রপ্তানি সম্ভাবনায় ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্ল্যাট : কৃষিপণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বিএডিসি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাষ্পতাপ প্রয়োগের মাধ্যমে আমসহ বিভিন্ন ফল ও সবজি জীবাণুমুক্তকরণ এবং সংরক্ষণকাল বৃদ্ধির মাধ্যমে সেগুলোকে রপ্তানি উপযোগী করার জন্য বিএডিসি কর্তৃক ঢাকার গাবতলীতে স্থাপন করা হয়েছে।

হাইব্রিড ভুট্টা বীজে নতুন সম্ভাবনা : ভুট্টা বীজ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মূলত আমদানিনির্ভর। ভুট্টা বীজ সরবরাহের ক্ষেত্রেও বিএডিসি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে দেশে ভুট্টা বীজের চাহিদা ছিল ১১ হাজার ৪৫৮ টন (কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০২৫)। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বিএডিসি স্বল্পমূল্যে দেশের সবচেয়ে উচ্চফলনশীল একটি জাত হাইব্রিড ভুট্টা (বি-৩৩৫৫) বীজ সরবরাহ করেছে। এর ফলে দেশে হাইব্রিড ভুট্টার বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয়ভাবে হাইব্রিড ভুট্টার বীজ উৎপাদনের পথ সুগম হবে।

সামনে আরও চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশের কৃষি এখন আর শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিরাপদ খাদ্য, জলবায়ু সহনশীল

কৃষি, পানি সাশ্রয়, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষি পণ্যের মানোন্নয়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা সবকিছু মিলেই গড়ে উঠেছে ভবিষ্যতের কৃষি। বিএডিসির ছয় দশকেরও বেশি সময়ের পথচলা মূলত বাংলাদেশের কৃষির পরিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি। এক সময় যেখানে খাদ্য ঘাটতি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে আজ কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। এই অগ্রযাত্রায় কৃষক যেমন প্রধান শক্তি, তেমনি কৃষকের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও প্রযুক্তি নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও অনস্বীকার্য। ৬৫ বছরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিএডিসির সামনে তাই একদিকে রয়েছে গৌরবময় অতীত, অন্যদিকে রয়েছে আরও বড় দায়িত্বের ভবিষ্যৎ। কৃষকের হাত ধরে মাঠ থেকে মানুষের পাতে খাদ্য পৌঁছানোর এই অবিচ্ছন্ন ধারাকে আরও সমৃদ্ধ ও টেকসই করতে বিএডিসি তার কার্যক্রমকে সময়ের সঙ্গে আরও আধুনিক ও জনমুখী করে এগিয়ে নিচ্ছে।