প্রশস্ত খালের উপর ছিল ব্রিজ। ব্রিজটির উপর দিয়ে চলতো যাত্রীবাহী বাস ও অন্যান্য যানবাহন।ব্রিজটি ভেঙ্গে গেলে সরকারিভাবে দরপত্র আহ্বান করে ভাঙ্গা ব্রিজটি অপসারণ করা হয়। খালের দুই পাশের বাসিন্দারা চাঁদা দিয়ে ঐ খালের উপর বানালো বাঁশের সাঁকো। খালের উপর দিয়ে নিজেদের টাকায় তৈরি বাঁশের সাঁকো দিয়ে শুরু হলো ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত।
সরকার আসে সরকার যায়,এই সাঁকোর যায়গায় পোল,ব্রিজ বা কালভার্ট কিছুই হয় না। নিজেদের প্রয়োজনে স্থানীয়দেরকে একইভাবে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুম শেষে পুরনো ভাঙ্গা সাঁকোটি মেরামত করতে হয়। এভাবেই কেটে গেল প্রায় ৫১ বছর। কিছুদিন আগে উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে ঐ খালের উপর নির্মাণ করা হলো কাঠের সেতু। সেতু নির্মাণের ফলে খালের দুই পাড়ের বাসিন্দাদের প্রায় পাঁচ দশকের সীমাহীন কষ্টের অবসান হয়েছে। হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের তমরদ্দি বাজারের দক্ষিনে কাটাখালি খালের উপর এ কাঠের সেতু দেয়া হয়েছে।
দীর্ঘ ৫১ বছর কাটাখালি খালের উপর বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচলকারীদের দুর্গতির অন্ত ছিল না। আবার কাটাখালি খালের দক্ষিন পাড়ের মুমূর্ষু রোগী বা আহত ব্যাক্তিদেরকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় বিনা চিকিৎসায় নিজ বাড়িতে মারা যাওয়ার উদাহরণ আছে অসংখ্য। একমাত্র এ সাকোঁ পার হয়ে উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হতো তিন গ্রামের মানুষকে। বর্ষায় প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় সাঁকো পার হতে গিয়ে নিচে পড়ে অঙ্গহানি হয়েছে অনেকের ।
উপজেলা সদর ওছখালি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তিন গ্রামের বাসিন্দাদেরকে কাটাখালি খালের উপর ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোর উপর দিয়েই চলাচল করতে হতো। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ওই গ্রামগুলোতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। দীর্ঘ ৫১ বছর পর সাঁকোর জায়গায় কাঠের সেতু তৈরি করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। নবনির্মিত কাঠের সেতুটি সাময়িকভাবে হলেও ঐ তিন গ্রামের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জীবনচক্র বদলে দিতে শুরু করেছে।
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের তমরদ্দি বাজার থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণে কাটাখালি খালের উপর সেতুটি অবস্থিত। এ খালের দক্ষিণ পাশের পূর্ব জোড়খালী, জোড়খালি ও কোরালিয়া গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের বাসিন্ধাদেরকে তমরদ্দি বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় যেতে কাটাখালি খালের উপর ঐ সাঁকো পার হয়েই যেতে হতো।
আশির দশকের আগে থেকে এই কাটাখালী খালের উপর ছিল ইট রড-সিমেন্ট-বালু দিয়ে নির্মাণ করা একটি ব্রীজ। এটির নাম ছিল 'কাটাখালী ব্রীজ'। এ সংবাদকর্মী নিজের চোখে দেখেছেন যে আশির দশকের শুরুতে যাত্রীবাহী বাসগুলো তৎকালীন থানা সদর বাথানখালী থেকে যাত্রা শুরু করে তমরদ্দি বাজার থেকে কাটাখালি ব্রিজের উপর দিয়ে সোনাদিয়া ইউনিয়নের চরচেঙ্গা বাজার হয়ে জাহাজমারা পর্যন্ত চলাচল করতো।
ভাঙ্গা ব্রিজটি অপসারণের পর কাটাখালি খালের উপর নির্মিত সাঁকোর উপর দিয়ে লোকজনের পারাপার শুরু হয়। সাঁকোর জায়গায় কাঠের সেতু নির্মিত হওয়ায় খালের উভয় পাড়ের বাসিন্দাদের ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে দীর্ঘ একান্ন বছরের খাল পারাপারের অসুবিধার অবসান হল।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুইশ ফুট এই সাঁকো পার হতে গিয়ে অনেক লোকজনকে দূর্ঘটনায় পড়তে হয়েছে। মুমূর্ষু রোগী, বয়স্ক ব্যাক্তি, গর্ভবতী মহিলা, শিক্ষার্থী ও পথচারী সবাইকে এই সাঁকো পার হয়ে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। ব্যবসায়িক দোকানের মালামাল মাথায় করে সাঁকোর উপর দিয়ে এপার ওপার করতে হতো। এই দীর্ঘ সময়ে সাঁকো পার হতে গিয়ে অঙ্গহানির ঘটনা আছে অনেকের। শিক্ষার্থীদেরকে সাঁকো থেকে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও আছে। মাথায় করে মালামাল পার করতে গিয়ে পঙ্গু হয়েছে কয়েকজন শ্রমিক।
সম্প্রতি তাদের দোকানে আলাপ হয় কোরালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ঐ খালপাড়ের বেড়ির উপরের দোকানদার নবির উদ্দিন (৫০) ও শমশের আলীর(৬০) সাথে। আলাপকালে শমশের আলী জানান, তার দোকানের মালামাল আনতে হয় তমরদ্দি বাজার থেকে। নিদিষ্ট ভ্যান গাড়ি চালক গাড়িতে মাল নিয়ে এসে খালের ওপারে রেখে মাথায় বহন করে সাঁকো পার হয়ে দোকানে পৌঁছে দেন। গত বছর এভাবে মাল আনতে গিয়ে চিনির বস্তাসহ সাঁকো ভেঙে খালে পড়ে যান নুর ইসলাম নামের ঐ ভ্যান চালক। তাতে তার এক হাত এক পা ভেঙে যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেও তিনি সুস্থ হননি। এখন পঙ্গু হয়ে ঘরে বসবাস করছেন।
শের আলী আরও জানান, এই সাঁকো পার হয়ে গ্রামের শিক্ষার্থীদেরকে তমরদ্দি উচ্চ বিদ্যালয় ও তমরদ্দি মাদ্রাসায় যেতে হয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে হঠাৎ এক ছাত্রী খালে পড়ে ভেসে যেতে থাকে। সাথে থাকা সহপাঠিদের চিৎকারে খালপাড়ের দোকান থেকে লোকজন দৌড়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।
গ্রামের প্রবীন বাসিন্ধা সিরাজ মিয়া (৮৫) জানান, শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় এই গ্রামের মেয়েদের বিয়েতে অনিহা ছিল অন্যান্য এলাকার মানুষদের। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই সাকোঁ পার হয়ে তমরদ্দি বাজারে আসা যাওয়া করেন। বিভিন্ন প্রয়োজনে সারাদিন আসা যাওয়া করলেও রাতে তা মোটেও সম্ভব ছিলনা। একবার ছেলে বউয়ের প্রথম সন্তান হওয়ার সময় সমস্যা দেখা দেয়। গ্রামের চিকিৎসকরা দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সারারাত অপেক্ষা করে পরদিন সকালে নৌকা দিয়ে খাল পার করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সিরাজ মিয়া আরও বলেন, নির্বাচন এলে বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধিরা আশ্বাস দিলেও পরে তা মনে রাখেনি। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোন এক কাজে এই গ্রামে আসতে গিয়ে সাঁকো দেখে থমকে দাঁড়ান। তিনি গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে এই সাঁকোর ইতিহাস শুনে অবাক হন। পরে তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে কাঠের এই সেতু তৈরি করে দেন। নিজের শেষ সময়ে এসে গ্রামের মানুষের এই কষ্ট লাঘব হওয়া দেখে অনেকটা আবেগাপ্লুত বৃদ্ধ সিরাজ মিয়া।
তমরদ্দি বাজার বনিক সমিতির সাবেক সভাপতি হোসেন আহম্মদ বলেন, কাটাখালি সেতু নির্মাণের ফলে তমরদ্দি বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য কয়েকগুন বেড়ে যাবে। হাতিয়ার দক্ষিণের নিঝুম দ্বীপ, জাহাজমারা ও চরচেঙ্গা বাজারসহ বিভিন্ন বাজারের সাথে তমরদ্দি বাজারের জমজমাট ব্যবসাবাণিজ্য চালু হবে।
জানা যায় প্রায় বিশ বছর আগে কাটাখালি ব্রিজ নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। একজন ঠিকাদার কাজ পেয়ে কাজ শুরু করলে ও মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির কারণে ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে ব্রিজ নির্মাণ কাজের মালামাল সরিয়ে নিয়ে যান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের অনেক লোক এক সাথে জড়ো হয়ে কাটাখালি সেতুটি দেখছেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই আনন্দে আত্মহারা। স্থানীয় বাসিন্ধারা ছাড়াও অন্যান্য এলাকা থেকেও লোকজন এই কাঠের সেতু দেখতে এসেছেন। এ দৃষ্টি নন্দন সেতুটি সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। নিচে সিমেন্টের খুঁটি দিয়ে তার উপর কাঠের পাটাতন দিয়ে পাশে দেওয়া হয়েছে হাতল। সম্পূর্ণ রঙ দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে পুরো সেতু। গ্রামের মানুষ সাইকেল ও মোটর সাইকেল চালিয়ে সেতু পারাপার হচ্ছে। সবার মধ্যে আনন্দ বিরাজ করছে। তাদের আশা এক সময় এই কাঠের সেতুও একদিন ইট পাথরের ব্রীজ হবে।
প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের সোনাদিয়া থেকে এই সেতুটি দেখতে এসেছেন আরিয়ান ফরিদ নামক একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটার। তিনি জানান, লম্বা সেতুটি বিশেষ রঙ দিয়ে সাজানো হয়েছে। দূর থেকে দেখতে অনেকটা সুবিশাল ব্রীজের মতোই মনে হয়। মনে হয় এটি ছোট কোন নদীর উপর নির্মিত কোন সেতু। এটি এখন দর্শনীয় স্থানে পরিনত হয়েছে।
এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থায় অসুবিধার কারনে দীর্ঘদিন এলাকাগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। মানুষের স্বভাবিক চাহিদা পুরণ করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। শুধু একটি সাঁকোকে সেতুতে রূপান্তর করে এই অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। এখানে ইট পাথরের সেতু তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বলা হয়েছে ।
প্রসঙ্গত: ২০১৯ সালে উপরোক্ত কাটাখালি খালের উপর দিয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের কষ্টকর যাতায়াতের একটি সচিত্র প্রতিবেদন দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশ হয়।