মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হওয়ার ঘটনা সেই আশঙ্কাকে আরও তীব্র করেছে। নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশিও রয়েছেন।
তাঁদের মৃত্যু আমাদের জন্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংঘাতের খবর নয়; এটি দেশের বাইরে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া মানুষের নিরাপত্তাহীনতারও মর্মান্তিক স্মারক। সৌদি কর্তৃপক্ষ এই হামলার জন্য ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনকে দায়ী করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা কি ইয়েমেনের যুদ্ধকে নতুন করে উসকে দেবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বিস্তৃত এক আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাত দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা এবং চীন-রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক হিসাব। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন আর একটি দেশ কিংবা দুটি পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি নতুন হামলা বৃহত্তর যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
ইয়েমেনের সংকটের শিকড় বহু পুরোনো। ২০১৪ সালে হুতি আন্দোলনকারীরা রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো। কিন্তু দীর্ঘ সামরিক অভিযানেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং দেশটি গৃহযুদ্ধ, দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের গভীরে নিমজ্জিত হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়েছে অসংখ্য মানুষ, বিপর্যস্ত হয়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে কোটি মানুষের জীবন।
হুতি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক নাম আনসারুল্লাহ। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি রয়েছে। ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং ইরানি সামরিক সহায়তার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচিত। তবে হুতিদের কেবল ইরানের হাতের পুতুল হিসেবে দেখলে ইয়েমেনের নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝা যাবে না। তাদের স্থানীয় ক্ষমতার ভিত্তি, রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে বিরোধ এবং নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে। ইরানের সমর্থন তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে, কিন্তু হুতিদের প্রতিটি পদক্ষেপকে তেহরানের নির্দেশের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে সংকটের প্রকৃত চরিত্র আড়াল হয়ে যায়।
অন্যদিকে সৌদি আরবের কাছে ইয়েমেন শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; এটি তার দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি। কিন্তু দীর্ঘদিনের সামরিক সংঘাত সৌদি আরবকেও একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা সম্ভব হলেও তার রাজনৈতিক ভিত্তি নিশ্চিহ্ন করা কিংবা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা আবারও দেখিয়ে দিল, যুদ্ধের আগুন একবার ছড়িয়ে পড়লে কোনো দেশের সীমান্ত কিংবা উন্নত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তাকে পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে পারে না।
বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে ইয়েমেনে সামরিক অভিযানের সময় হাসপাতাল, বিদ্যালয়, বন্দর ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কোনো পক্ষের আগের হামলা অন্য পক্ষকে নিরীহ মানুষ হত্যার বৈধতা দেয় না। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মূল কথা হলো, যুদ্ধের মধ্যেও বেসামরিক মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলোতে বারবার দেখা যাচ্ছে, সামরিক লক্ষ্য অর্জনের প্রতিযোগিতায় সাধারণ মানুষের জীবনই সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হচ্ছে।
রিয়াদে হামলার গুরুত্ব এখানেই যে, এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা-পাল্টা হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাত বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের নতুন ফ্রন্টে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেয়, তাহলে সংঘাতের পরিধি আরও বাড়তে পারে। ওয়াশিংটনের কাছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজের প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের অর্থ হবে নতুন করে অস্ত্র ও জনবল ব্যয়, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির সম্ভাবনা। হুতিদের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে তাদের আক্রমণক্ষমতা সাময়িকভাবে কমানো সম্ভব হলেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট কিংবা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের সমাধান হবে না।
এখানে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশ এই পথের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব দ্রুত বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। জাহাজের বিমা ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, জ্বালানির দাম অস্থির হয়ে উঠবে এবং শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে খাদ্য পরিবহন পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এর পরিণতি হতে পারে আরও কঠিন। তেল ও গ্যাসের আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের খরচ বাড়বে, কৃষির সেচব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বিপদ শুধু হরমুজ প্রণালিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রয়েছে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি। হরমুজ যেমন উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ, বাব আল-মান্দেব তেমনি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে এশিয়া-ইউরোপের বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম প্রবেশদ্বার। ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হুতিদের সামরিক তৎপরতা এই পথের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে হরমুজে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এবং বাব আল-মান্দেব ঘিরে হুতি-সৌদি লড়াই একই সময়ে তীব্র হলে বিশ্ববাণিজ্য এক অভূতপূর্ব সংকটে পড়তে পারে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ অচল হলে বিকল্প পথ ব্যবহার করা যায়, কিন্তু তাতে পরিবহন সময় ও ব্যয় বেড়ে যায়। দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথেই অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সেই চাপ আরও বাড়বে। জাহাজকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলতে হতে পারে, সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে এবং জ্বালানি ও পণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এ কারণেই রিয়াদে হামলাকে শুধু একটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়।
এই পরিস্থিতিতে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের পাশাপাশি চীন ও রাশিয়া নিজেদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। তবে দুই দেশের স্বার্থ ও ভূমিকা এক নয়। চীনের কাছে মধ্যপ্রাচ্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের উৎস, বিশাল বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। ইরানের সঙ্গে চীনের সহযোগিতা রয়েছে, আবার সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তার গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া কিংবা সমুদ্রপথে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া বেইজিংয়ের স্বার্থের অনুকূল নয়।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দেখিয়েছিল, আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে বেইজিং ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান সংকটেও চীন চাইলে ইরান, সৌদি আরব এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে। তবে কূটনৈতিক প্রভাব থাকা আর যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করার ক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়। চীনের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
রাশিয়ার হিসাবও জটিল। ইরানের সঙ্গে তার সহযোগিতা রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলা করা মস্কোর দীর্ঘদিনের কৌশলগত লক্ষ্য। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত রাশিয়াকে কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির সুযোগ দিতে পারে। তেলের বাজারে অস্থিরতাও রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানিতে কিছু সুবিধা তৈরি করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকি রাশিয়ার জন্যও কম নয়। তাই মস্কোকে কেবল ইরানের মিত্র কিংবা সংঘাতের সুবিধাভোগী হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়বে না। রাশিয়া ও চীন উভয়েরই উচিত নিজেদের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে উঠে যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক আলোচনার পক্ষে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া।
তবে শেষ পর্যন্ত এই সংকটের সমাধান চীন বা রাশিয়া একা করে দিতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন পক্ষকে আলোচনায় ফিরতে হবে। সামরিক শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার নামে যদি এক পক্ষ অন্য পক্ষকে চাপে রাখতে চায়, তাহলে সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অস্ত্র বানালে তার মূল্য দিতে হবে বিশ্ব অর্থনীতিকে। জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি তাৎক্ষণিক উদ্বেগ আমাদের প্রবাসী নাগরিকদের নিরাপত্তা। সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমজীবী মানুষ বসবাস করেন। তাঁরা কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, পরিবারের ভরণপোষণ করেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। অথচ যুদ্ধের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে তাঁদের অনেকেরই নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। রিয়াদে দুই বাংলাদেশির প্রাণহানি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক সংঘাতের সংবাদে যাঁরা সংখ্যায় পরিণত হন, তাঁদের প্রত্যেকের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, জীবিকার সংগ্রাম এবং দেশে অপেক্ষমাণ স্বজনদের স্বপ্ন।
বাংলাদেশ সরকারের উচিত সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিহতদের মরদেহ দেশে আনা, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রয়োজন হলে নিরাপদ আশ্রয় বা স্থানান্তরের প্রস্তুতি রাখতে হবে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও আয়েও প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় সরকারকে আগাম পরিকল্পনা করতে হবে। আতঙ্ক ছড়ানো নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, যুদ্ধের সমাধান আরেকটি যুদ্ধ নয়। সৌদি আরবের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইয়েমেনের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপদ জীবনের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে হবে; একইভাবে ইয়েমেনের জনগণের ওপর নির্বিচার সামরিক আঘাতও বন্ধ করতে হবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে প্রতিপক্ষকে সাময়িকভাবে পিছু হটানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। জাতিসংঘ, চীন, রাশিয়া এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব হলো সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া।
রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা আমাদের সামনে আবারও সেই কঠিন সত্য তুলে ধরেছে—আধুনিক অস্ত্র, শক্তিশালী সেনাবাহিনী কিংবা উন্নত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কোনো দেশকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে পারে না, যদি তার চারপাশের রাজনৈতিক সংকট অমীমাংসিত থাকে। হরমুজে উত্তেজনা, বাব আল-মান্দেবে অস্থিরতা, ইয়েমেনে যুদ্ধ এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত বহু দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের প্রয়োজন আরেকটি যুদ্ধ নয়; প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, যেখানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনগণের অধিকার পরস্পরের প্রতিপক্ষ হবে না। প্রতিশোধের রাজনীতি সাময়িক শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। রিয়াদে নিহত মানুষদের স্মৃতি, আহতদের যন্ত্রণা এবং ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের মানবিক বিপর্যয় আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। এখন প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলো কি এই রক্তক্ষয় থেকে শিক্ষা নেবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে? উত্তর নির্ভর করছে তারা সামরিক প্রতিশোধের বদলে সংলাপ, সংযম ও রাজনৈতিক সমাধানকে কতটা গুরুত্ব দেয় তার ওপর।
লেখক: শিক্ষাবিদ,প্রাবন্ধিক ও নদী আন্দোলনের সংগঠক
ইমেইল : nazrul.hakkani@gmail.com