ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের স্বীকৃতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: মাহ্দী আমিন

আধুনিক পাঠ্যক্রম, বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের প্রকৌশলীদের দক্ষ করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ জন্য প্রকৌশল শিক্ষায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা এবং আরও বেশি শিক্ষাক্রমকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আওতায় আনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ওয়াশিংটন অ্যাকর্ড বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই কাঠামোর আওতায় আরও বেশি প্রকৌশল শিক্ষাক্রমকে নিয়ে আসতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

রবিবার (১১ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘বিএইটিই জাতীয় সিম্পোজিয়াম ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। 

দ্য ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি)-এর বোর্ড অব অ্যাক্রেডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন (বিএইটিই) এ সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে মাহ্দী আমিন বলেন, সারা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা নিজেদের দক্ষতা ও মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। তাই তরুণদের মেধার ঘাটতি নেই; বরং তাদের জন্য যথাযথ সুযোগ, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করাই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

প্রকৌশল শিক্ষার মানোন্নয়নে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্তসীমান্ত শিক্ষার প্রসারে আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন অ্যাকর্ড ও ডাবলিন অ্যাকর্ড এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দেশের প্রকৌশল শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে কার্যকর ও সমন্বিত মানদণ্ড গড়ে তুলতে হবে।

শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপযুক্ত অনুপাত নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণার পরিবেশ তৈরি এবং আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। পাশাপাশি মানসম্পন্ন গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবোটিক্সের মতো আধুনিক উদ্ভাবন প্রকৌশল শিক্ষার ধরন বদলে দিচ্ছে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে কাজে লাগাতে নৈতিকতাভিত্তিক শিক্ষা অপরিহার্য। এআই নিজে কোড লিখতে পারে কিংবা জটিল সমস্যার সমাধান দিতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহারে নৈতিকতা ও সুবিবেচনা নিশ্চিত করতে মানুষের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, সরকার এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যার মাধ্যমে প্রকৌশলীরা নৈতিকতার মানদণ্ড মেনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই সফল হতে পারবেন।

শিক্ষা এখন ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করেছে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেই তরুণেরা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়া কিংবা নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করার সুযোগ পাবেন। আধুনিক পাঠ্যক্রম, বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগের মাধ্যমে প্রকৌশলীদের দক্ষতা আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনের মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে এই সুযোগ তৈরি করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দক্ষ প্রকৌশলীদের ভূমিকা অপরিসীম বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, সেতু, রেলপথ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও আধুনিক স্থাপনা নির্মাণসহ দেশ গড়ার প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকৌশলবিদ্যার প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। তাই দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় তরুণ প্রকৌশলীদের মেধার পূর্ণ বিকাশে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেবে।

মাহ্দী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সব নীতি প্রণয়নে দেশের মানুষকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন এবং তরুণ প্রজন্মের ক্ষমতায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের যৌথ উদ্যোগে সমন্বিত নীতিকাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের আট মাসের যাত্রায় শিক্ষা ও প্রযুক্তির মানোন্নয়নে কাজ শুরু হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে দেশের আরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকৌশল শিক্ষাক্রমকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আওতায় আনতে সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশে প্রকৌশল শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সমতা প্রতিষ্ঠায় বিএইটিইর উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তরুণ জনগোষ্ঠী ও জনমিতিক লভ্যাংশ। প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করছে। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার তরুণ প্রকৌশলবিদ্যার বিভিন্ন শাখায় ভর্তি হচ্ছে।

বিপুলসংখ্যক প্রকৌশল শিক্ষার্থীর শিক্ষার মানে পার্থক্য থাকার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদানের সমমান এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে গুণগত মানের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ব্যবধান রয়েছে। দেশের মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিক্ষাদান ও ডিগ্রি প্রদানের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ মানদণ্ড প্রয়োজন। এতে স্নাতকেরা চাকরির বাজারে প্রবেশ কিংবা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা যথাযথভাবে প্রমাণ করতে পারবেন।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের পাশাপাশি প্রকৌশল শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে বিএইটিইর যৌথ ও পরিপূরক ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। মাহ্দী আমিন বলেন, বিএইটিই নির্দিষ্ট শিক্ষাক্রমের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কাজ করতে পারে। এর মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের অনুমোদনপ্রক্রিয়াও আরও সুসংহত হবে।

বিএইটিই ইতিমধ্যে ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন করায় এই কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও বিস্তৃত ও গতিশীল করার আহ্বান জানান মাহ্দী আমিন। তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রকৌশল শিক্ষাকে বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার তাগিদ দেন তিনি।

বিএইটিইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তানভীর মনজুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন— ডাবলিন অ্যাকর্ডের চেয়ার অধ্যাপক ই. ড. মেগাত জোহারি মেগাত মোর্দ নূর, ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের চেয়ার অধ্যাপক ড. কাই স্যাং লক, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন খান, আইইবির সভাপতি প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব।