আটকে গেল হাজারো স্বপ্ন

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। গত শনিবারের এই হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ ১২ জন মারা গেছেন এবং প্রায় তিন শতাধিক আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় ঢাকা-রিয়াদ বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কয়েক হাজার বাংলাদেশি। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবার। ঢাকা থেকে রিয়াদগামী এবং রিয়াদ থেকে ঢাকামুখী একাধিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন দেশে ফেরা ও কর্মস্থলে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা।

বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় শনিবার রাত থেকে রবিবার পর্যন্ত রিয়াদগামী আটটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে প্রায় ৪ হাজার যাত্রীর সৌদি আরব যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া রিয়াদ থেকে ঢাকায় ফিরতে পারছেন না চার হাজারের বেশি যাত্রী। সব মিলিয়ে দুই দেশের আকাশপথে আটকে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। রিয়াদের পাশাপাশি জেদ্দা এয়ারপোর্টেও ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ওমরাহর যাত্রীরা পড়েছেন বেকায়দায়।

গতকাল সকালে দুপুরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, রিয়াদগামী ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে নিয়ে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাউন্টারে খোঁজ নিচ্ছেন। কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরবর্তী করণীয় জানার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ টিকিটের তারিখ পরিবর্তন কিংবা বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না, কবে সৌদি আরবে ফিরতে পারবেন।

শাহজালাল বিমানবন্দরের সিকিউরিটি ম্যানেজার (ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট) স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব বলেন, আটটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এ বিষয়ে অবহিত করছে। যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী যাত্রার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

বিমানবন্দরে যাত্রীদের কান্না-ছোটাছুটি : বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে রিয়াদপ্রবাসী কুমিল্লার আমিনুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিয়াদে যাওয়ার জন্য বিমানের ফিরতি টিকিট কেটে আগস্টে দেশে এসেছিলাম। আজ দুপুরে আমার ফ্লাইট ছিল। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। এখন কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদিতে সময়মতো ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়ব। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত।’ শরিয়তপুরের হামিদুলেরও সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের টিকিট কেটেছিলেন তিনি। মুম্বাই হয়ে রিয়াদে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এখন সেই যাত্রা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিকল্প পথে ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। এখন মুম্বাই থেকেও নাকি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফলে সৌদি যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’

বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আকাশপথ : সৌদি আরবের রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ঢাকা-রিয়াদ আকাশপথের যোগাযোগ। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে বিপাকে পড়েছেন প্রবাসীরা। কারও সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরার তাড়া, কারও আবার পরিবারের কাছে ফেরার অপেক্ষা। ফ্লাইট বাতিলের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি নতুন করে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচের চাপও তৈরি হয়েছে। কবে আবার যাত্রা শুরু হবে, তা নিয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাচ্ছেন না অনেকে। অপরদিকে, সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আগামী ১২ অক্টোবর ভোর ৩টা পর্যন্ত সব ধরনের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে ঢাকা থেকে রিয়াদগামী আরও ফ্লাইট বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত কর্মস্থলে ফিরতে বিকল্প রুটে টিকিট খুঁজছেন প্রবাসীরা। তবে ঢাকা-জেদ্দা ও ঢাকা-মদিনা রুটসহ বিকল্প গন্তব্যের টিকিটের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে বিপাকে পড়েছেন তারা। বিকল্প পথে যাত্রার ক্ষেত্রেও ফ্লাইট পরিচালনা ও ট্রানজিটের অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতার আশঙ্কা : রিয়াদে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় শুধু বাংলাদেশ থেকে যাওয়া যাত্রীরাই নন, দেশে ফিরতে চাওয়া প্রবাসীরাও বিপাকে পড়েছেন। যাদের ছুটি শেষ হয়েছে, তাদের কর্মস্থলে ফেরার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আবার যারা দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদেরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, ভিসার মেয়াদ ও অন্যান্য অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রবাসীরা। তাদের দাবি, ফ্লাইট পুনরায় চালুর সময়সূচি, টিকিটের তারিখ পরিবর্তন, অর্থ ফেরত এবং বিকল্প ফ্লাইটের বিষয়ে এয়ারলাইনসগুলোর কাছ থেকে দ্রুত ও স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হোক। এতে কর্মস্থলে ফিরতে অপেক্ষমাণ প্রবাসীদের ভোগান্তি কিছুটা কমবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, রিয়াদ বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় বিমানের ১১ ও ১২ অক্টোবরের ঢাকা-রিয়াদ ও রিয়াদ-ঢাকা রুটের নির্ধারিত বিজি ৩৩৯ এবং বিজি ৩৪০ ফ্লাইট দুটি স্থগিত করা হয়েছে। ফ্লাইট এবং পরিবর্তিত সময়সূচি সম্পর্কে আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টায় অবহিত করা হবে।

কাজে যোগ দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ : যাদের কর্মস্থলে নির্দিষ্ট সময়ে যোগ দেওয়ার কথা, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগের। কেউ ছুটি শেষে সৌদি আরবে ফিরতে চাচ্ছেন, কেউ নতুন চাকরি নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। ফ্লাইট বাতিলের কারণে তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা, কর্মস্থলে যোগদান এবং পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সময়সূচি সবই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের বিমান চলাচল পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের সূত্রপাত কয়েক দিন আগে থেকেই। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের কারণে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়। শ্রমিক রহিম উদ্দিন জানান, মঙ্গলবার (আগামীকাল) রিয়াদে তার কাজে যোগ দেওয়ার কথা। এখন কী করব বুঝতে পারছি না। একই কথা বলেছেন, আব্দুর রাজ্জাক। তার কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে আগামী বুধবার। যুদ্ধ কবে থামবে জানি না। ছুটি শেষে কাজে ফেরার জন্য অনেকেই টিকিট কেটেছেন, অনেকেরই নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় কাজে যোগ দেওয়া নিয়ে তারা উদ্বেগের মধ্যে পড়েছেন।

নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ : নতুন ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকদেরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হচ্ছে। নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ, কর্মস্থলে যোগদানের সময়সীমা এবং যাত্রাসংক্রান্ত কাগজপত্রের মেয়াদ নিয়ে তাদের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিমান টিকিট, যাতায়াত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সবকিছু নিয়োগকর্তা দিয়েছেন। প্রবাসীরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তাদের মধ্যে কেউ আশার বাণী দিচ্ছেন। আবার কেউ সান্ত¡না দিলেও আশ্বাস দিচ্ছেন না।

জেদ্দা বিমানবন্দর নিয়েও উদ্বেগ : রিয়াদের পাশাপাশি জেদ্দা বিমানবন্দর নিয়েও যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দর বাংলাদেশের সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগের অন্যতম প্রবেশদ্বার। হজ ও ওমরাযাত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণির যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। রিয়াদে হামলার পর সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা নিয়ে হুতিদের সতর্কবার্তার কারণে অন্যান্য রুটের যাত্রীরাও ফ্লাইটের সময়সূচি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশ থেকে রিয়াদে ফ্লাইট যায়নি এবং আসেনি। এতে ওমরা হজযাত্রীরাও পড়েছেন বিপাকে। পাশাপাশি শ্রমিকরাও পড়েছেন সমস্যায়। জেদ্দা বিমানবন্দরে নিযুক্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কান্ট্রি ম্যানেজার বলেছেন, ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে বিমান ছাড়তে পারছি না। এ কারণে ঢাকাগামী ফ্লাইটের যাত্রীরা আটকা পড়েছেন। পরিস্থিতির কারণে এখনো যাত্রীদের বোর্ডিং শুরু করা সম্ভব হয়নি।’ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে ঢাকাগামী যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে।

মাঝ আকাশ থেকে ফিরছে ফ্লাইট : রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটও বাধার মুখে পড়েছে। ঢাকা থেকে রিয়াদগামী ফ্লাইটটি ওমানের মাসকাট থেকে ঢাকায় ফিরে আসে। গত এক সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে অন্তত এ নিয়ে চারবার হামলা হয়েছে। এরমধ্যে গত বৃহস্পতিবার এক পাইলটসহ তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন। হুতিরা ওই দিন বিমানবন্দরের অবকাঠামোর পাশাপাশি সৌদিয়া এয়ারলাইনসের একটি বিমানকেও টার্গেট করে হামলা চালায়। এতে ওই পাইলটের মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।