রিয়াদ বিমানবন্দরে ভয়াবহ হুতি হামলা

ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের সঙ্গে আকাশপথে বিভিন্ন দেশের যোগাযোগ বন্ধ হতে শুরু করেছে। পবিত্র দুই নগরী মক্কা ও মদিনা ছাড়া সব সৌদি বিমানবন্দর ইরানপন্থি হুতিদের আক্রমণের টার্গেট হওয়ায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে দেশটির সঙ্গে উড়োজাহাজ চলাচল স্থগিত করেছে। সমুদ্রপথে যোগাযোগের দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি হরমুজ ও বাব-আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের টানা যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরবে হুতিদের এ হামলা মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তাকে দীর্ঘায়িত হতে পারে, এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিভিন্ন দেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক হতাহত হওয়ায় সৌদি-হুতি উত্তেজনা অন্য দেশগুলোতেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত শনিবার  কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১২ ব্যক্তি নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশের নাগরিক। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাতে সৌদি গেজেটের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।  রিয়াদ বিমানবন্দরের টার্মিনাল ৩-এর ওপর শনিবার বিকেলে ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়লে সেখানে অপেক্ষমাণ দুই বাংলাদেশি নিহত হন।

নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি ছাড়াও চারজন সৌদি নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।

ঢাকায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, নিহত দুই বাংলাদেশি হলেন বগুড়ার শাহেদ আহম্মেদ ও কুমিল্লার নাসরুল্লাহ বদরপুরি। শাহেদ আহম্মেদের (পাসপোর্ট নম্বর ইএন-০২২০০২৪) বাড়ি বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর থানার মাদলা গ্রাম। তার পিতা মো. রফিকুল ইসলাম এবং মা মোসা. শাহেরা বেগম। নাসরুল্লাহ বদরপুরির (পাসপোর্ট নম্বর এ-২২৭৫৮১৯৪) বাড়ি কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট থানার বদরপুর গ্রামে। তার পিতা মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ ও মা জাহানারা বেগম।  

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যানুযায়ী, আহতদের মধ্যে ২৭ জন বাংলাদেশের নাগরিক। তারা সবাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, আহতদের মধ্যে চারজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। 

রিয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম দেলোয়ার হোসেনসহ দূতাবাসের কর্মকর্তারা হতাহতদের খোঁজখবর নিতে নিয়মিত সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ঢাকায় গতকাল রবিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, রিয়াদে যে দুজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, তাদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ১৪ বাংলাদেশি ইতিমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ বিপর্যয় বন্ধ হবে।

বাংলাদেশ সরকার গতকাল এক বিবৃতিতে সৌদি আরবে হামলা ও দুই বাংলাদেশির প্রাণহানির ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে বলেছে, বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করা এবং বেসামরিক স্থাপনায় হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এ ঘটনায় সৌদি আরবের সরকার ও জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সংহতিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। চলমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার শত্রুতা বন্ধ, বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।

রিয়াদের কূটনৈতিক সূত্রের তথ্যানুযায়ী, বিমানবন্দরে হামলার সময় হতাহত হননি, বাংলাদেশগামী এমন যাত্রীদের হোটেলে এবং একটি বিশ^বিদ্যালয়ের আবাসিক হলে রাখা হয়েছে।

হামলায় বাংলাদেশের কোনো উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ রকম কোনো তথ্য নেই।  

বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বাংলাদেশ থেকে সৌদিগামী ফ্লাইট আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। গতকাল রবিবার সব ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তিন হাজারের বেশি যাত্রী আটকা পড়েছেন, যাদের অধিকাংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে কাজে যাচ্ছিলেন।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের কাজের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র সৌদি আরবের সঙ্গে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় অনেক কর্মীর কাজে যোগদান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সৌদি আরবে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন।

এদিকে হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করতে যাত্রী ও এয়ারলাইনসগুলোকে সতর্ক করেছে। গতকাল রবিবার সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ সতর্কবার্তা দেন হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি। তিনি বলেন, সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমায় হামলা চালাতে পারে তাদের বাহিনী। তবে মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দর এ হামলার হুমকির আওতার বাইরে থাকবে। তিনি বিমান সংস্থা, নৌপরিবহন সংস্থা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও যাত্রীদের সতর্কবার্তাটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানান।

 সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, বিমানবন্দরে হামলাকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে অভিহিত করে কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে জানান। তিনি আরও জানান, সৌদি আরবের দাম্মামে কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও একটি প্রজেক্টাইল সদৃশ্য বস্তু আঘাত হেনেছে।