মার্সিসাইডের থমথমে বাতাস আর অ্যানফিল্ডের বাইরে সমর্থকদের চিৎকার যেন একটি যুদ্ধক্ষেত্রের আবহ তৈরি করেছিল। প্রিমিয়ার লিগের অর্থনৈতিক ফেয়ার প্লে বিধি ভঙ্গের ১১৪টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর প্রথমবারের মাঠে নেমেই কঠিন এই পরীক্ষার মুখে পড়েছিল ম্যানচেস্টার সিটি। স্টেডিয়ামে প্রবেশমুখের প্রতিটি গলিতে তখন লাল রঙের বিদ্রূপের ঢেউ। ১৫ পাউন্ডে বিক্রি হওয়া জেলের পোশাকে সিটির ফুটবলারদের কৃত্রিম ছবি সংবলিত ব্যানার, ‘গিল্টি ১১৪’ লেখা ফ্ল্যাগ আর ‘প্রতারক’ ধ্বনিতে অ্যানফিল্ডে এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে লিভারপুল ভক্তরা।
উত্তেজনা এতটাই চরমে ছিল যে, সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা এড়াতে পুলিশি প্রহরায় কৌশল বদলে বিপরীত দিকের সড়ক দিয়ে পেছনের রাস্তা দিয়ে স্টেডিয়ামে ঢোকানো হয় সিটি ফুটবলারদের বাস।
তবে স্বাগতিকদের উগড়ে দেওয়া এই বিষোদগার আর চরম উসকানির বিপরীতে সফরকারী সিটির সমর্থকেরা কোনো সহিংসতায় না জড়িয়ে জবাব দিল এক অভিনব ও বিদ্রূপাত্মক উপায়ে। লাল সমুদ্রের ছোট্ট এক কোণে আকাশী-সাদা সমর্থকদের হাতে হঠাৎই দোলে শত শত হলুদ রঙের প্লাস্টিকের ফোলানো কলা!
হুট করে ফুটবল মাঠে দেখা যাওয়া এই কলার প্রদর্শন কিন্তু স্রেফ কোনো তাৎক্ষণিক রসিকতা নয়। এর শিকড় প্রোথিত সিটির প্রায় চার দশকের পুরোনো ও গভীর এক গ্যালারি সংস্কৃতির ভেতরে। ১৯৮৭ সালে মেইন রোড স্টেডিয়ামে ফ্র্যাঙ্ক নিউটন নামে এক সিটি ভক্ত প্রথম এই ফোলানো কলা নিয়ে উপস্থিত হন। সেই সময় ক্লাবের হাঙ্গেরিয়ান তারকা ফরোয়ার্ড ইমরে ভারাদির জনপ্রিয়তায় সমর্থকেরা প্রতি ম্যাচে চিৎকার করত, ‘ইমরে ব্যানানা’। সেখান থেকেই কলার সাথে সিটি ভক্তদের এক আত্মিক পরিচয় তৈরি হয়।
বিশেষ করে ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে ক্লাবটি যখন ইংলিশ ফুটবলের দ্বিতীয় বিভাগে নেমে দুঃসময় পার করছিল, তখন ক্ষোভ আর হতাশাকে একপাশে সরিয়ে রেখে গ্যালারিতে আনন্দ ধরে রাখার প্রতীক হয়ে উঠেছিল এই ফোলানো কলা।
অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে অলরেডস ভক্তরা যখন ‘বিলিয়ন ব্যাংক নিয়ে সিটি এবার নিচে নেমে যাচ্ছে’ স্লোগান দিয়ে খোঁচা দিচ্ছিল, তখন এই কলাই ছিল সিটির শেকড় ও দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী। আবুধাবির পেট্রোডলার বা সাম্প্রতিক ট্রফির জাঁকজমক আসার বহুকাল আগেই ১৮৯৪ সাল থেকে সিটির যে স্বতন্ত্র পথচলা ছিল, রেলিগেশনের আশঙ্কার মুখে দাঁড়িয়েও সমর্থকেরা মূলত সেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেই মনে করিয়ে দিয়েছেন। গ্যালারিতে নিজেদের এই অবস্থান নিয়ে সিটি সমর্থকগোষ্ঠী '১৮৯৪ গ্রুপ'-এর এক প্রতিনিধি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ম্যানচেস্টার ইভনিং নিউজ’-কে বলেন, ‘আমরা সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, আমরা যে লিগেই খেলি না কেন, সব সময় সিটির পাশে থাকব।’
আবার লিভারপুল সমর্থকদের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সিটির কট্টর সমর্থকেরা ক্লাবটির চেয়ারম্যান খালদুন আল-মোবারকের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সমস্বরে স্লোগান তোলেন। স্টেডিয়ামের বাইরে সেই প্রতিবাদের সুর নিয়ে ক্লাবটির সমর্থকেরা স্লোগান দেন, ‘আমরা ম্যান সিটি, যখন খুশি আমরা চিট বা প্রতারণা করব!’
মাঠের বাইরের এই মনস্তাত্ত্বিক স্নায়ুযুদ্ধে প্লাস্টিকের কলা দিয়ে যেমন পাল্টা বিদ্রূপ ছুড়েছেন সমর্থকেরা, তেমন মাঠের লড়াইয়ে আসল জবাবটা দিয়েছেন এনজো মারেস্কার শিষ্যরা। প্রথমার্ধের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ম্যাচের ৬২তম মিনিটে লিভারপুলের রাইয়ান গ্রাভেনবারখ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখে মাঠ ছাড়লে মোড় ঘোরে খেলায়।
১০ জনের দলে পরিণত হওয়া লিভারপুলকে আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়নি সিটি। মাত্র ১৩ মিনিটের এক তাণ্ডবে ৬৫তম মিনিটে আর্লিং হালান্ড, ৬৮তম মিনিটে জেরেমি ডোকু এবং ৭৮তম মিনিটে তরুণ রায়েন চেরকির গোল অ্যানফিল্ডের গ্যালারিকে মুহূর্তেই নিস্তব্ধতায় ডুবিয়ে দেয়। বিষাক্ত আবহ, তাচ্ছিল্য আর 'প্রতারক' ব্যানার উপেক্ষা করে ৩-০ ব্যবধানের জয়ে প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষস্থান আরও মজবুত রেখে হাসিমুখে মাঠ ছাড়ে ম্যানচেস্টার সিটি।