আর কয়েক দিন পরই শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এ উৎসবকে সামনে রেখে পাবনার চাটমোহর উপজেলার নিমাইচড়া ইউনিয়নের গুমানী নদীর তীরবর্তী বেলগাছি পালপাড়ায় চলছে প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা। শেষ মুহূর্তে মাটি তৈরি, খড় বাঁধা, প্রতিমা রোদে শুকানো ও রঙের শেষ আঁচড় দিতে দিনরাত কাজ করছেন কারিগররা।
এবার বেলগাছি পালপাড়ায় তৈরি করা হচ্ছে অর্ধশতাধিক দুর্গাপ্রতিমা। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগর ও সহকারী মৃৎশিল্পীরা। এরই মধ্যে বেশ কিছু প্রতিমা বিভিন্ন মণ্ডপে পাঠানোও শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি বেলগাছি পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমা তৈরিকে ঘিরে সেখানে কর্মব্যস্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমানতালে কাজে সহযোগিতা করছেন। স্থানীয় মণ্ডপের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকার মণ্ডপ থেকেও প্রতিমা তৈরির কাজ এসেছে।
মৃৎশিল্পী দুলাল পাল বলেন, বেশির ভাগ প্রতিমার মাটির কাজ শেষ হয়েছে। সেগুলো রোদে শুকানো হচ্ছে। কয়েকটিতে রঙের প্রলেপ দেওয়ার কাজও শুরু হয়েছে। নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী প্রতিমা তৈরি হচ্ছে কি না, তা বারবার পরীক্ষা করতে হচ্ছে। একটি প্রতিমায় রঙ করতে অন্তত দুই দিন সময় লাগে। হাতে সময় কম থাকায় দিনরাত কাজ করতে হচ্ছে।
পালপাড়ার কারিগর অপূর্ব পাল ও সনাতন পাল জানান, প্রতিমার আকার ও নকশার ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করা হয়। এবার ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যের প্রতিমা তৈরি করছেন তারা।
প্রতিমা তৈরির কাজে নিয়োজিত দীপা রানী পাল ও সুচিত্রা রানী পাল বলেন, বছরের অন্য সময় কাজের চাপ কম থাকলেও দুর্গাপূজার আগে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। পরিবারের ছোট-বড় সবাই মিলে কাজ করায় এ সময়ে আয়-রোজগারও বাড়ে।
ভাঙ্গুড়ার প্রকাশ চন্দ্র পাল ৪০ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, এবার ১০টি প্রতিমা তৈরির কাজ করেছেন। একটি প্রতিমা তৈরিতে তিন থেকে পাঁচজন সহকারী শিল্পীর প্রয়োজন হয়। প্রতিমার আকার অনুযায়ী তৈরিতে এক সপ্তাহ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে।
ফটিক পাল ও রাম চন্দ্র পাল জানান, আগের তুলনায় প্রতিমা তৈরির উপকরণ- খড়, মাটি, কাঠ ও রঙের দাম বেড়েছে। তবে সেই অনুপাতে মজুরি বাড়েনি। পরিশ্রমের তুলনায় একটি প্রতিমা তৈরি করে সামান্য লাভ থাকে। অন্য কোনো কাজ জানা না থাকায় বাপ-দাদার শেখানো এ পেশা আঁকড়ে ধরেই কোনো রকমে টিকে আছেন তারা।
উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এবার চাটমোহর উপজেলায় মোট ৫৪টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপিত হবে। পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে দেবী দুর্গাকে মণ্ডপে অধিষ্ঠিত করা হবে। ২০ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি প্রভাষ কুমার ভদ্র জানান, চলতি বছর পাবনা জেলায় মোট ৩৫৫টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। উৎসব নির্বিঘ্ন ও আনন্দমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।
পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি প্রবেশপথ নির্মাণ, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং প্রতিটি মণ্ডপে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হবে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীও যৌথভাবে নজরদারি করবে।