বাড়ি ফিরেছিল জান্নাতুল তাজমিন। কিন্তু ঘরের দরজা তার জন্য খোলেনি। গভীর রাতে রেসকোর্স এলাকার বাসার প্রধান ফটক বন্ধ পেয়ে মা-বাবাকে ফোন করেছিল সে। সাড়া না পেয়ে যোগাযোগ করেছিল কক্সবাজারে পরিচিত তরুণ রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে। এরপর এক অটোরিকশাচালকের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিল সে। সেই যাত্রাই যে তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে, তা কি জানত সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী?
কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে কুমিল্লায় নিহত কিশোরী জান্নাতুল তাজমিন এর ' কথিত বন্ধু ' রিয়াজ উদ্দিন (২১) কে আটক করেছে পুলিশ। গত শনিবার আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সুমন ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে ঘটনার প্রতিটি দিক যাচাই করতে ফরেনসিক পরীক্ষাসহ অন্যান্য তদন্ত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
বরিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কলাতলী চন্দ্রিমা উদ্যান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। তাকে আজ সোমবার (১২ সেপ্টেম্বার) দুপুরে কুমিল্লায় নিয়ে আসা হয়। পরে কুমিল্লা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি কৃষিজমি থেকে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে উদ্ধার করা হয় ১৪ বছর বয়সী তাজমিনের মরদেহ। পুলিশের ভাষ্য, অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে তাজমিনের মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল, তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না এবং এই ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা। এ জন্য তাজমিনের ময়নাতদন্তের সময় সংগ্রহ করা সোয়াবের নমুনা, পরিধেয় পোশাক ও ব্যবহৃত মুঠোফোনের আলামত ঢাকায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালমাই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল্লাহ আল ফারুক রোববার আদালতে এসব আলামত পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন।
শেষ রাতে রাজুর সঙ্গে যা কথা হয়েছিল: তাজমিনের নিখোঁজ হওয়া ও হত্যাকাণ্ডের আগে তার কক্সবাজার যাত্রা নিয়ে সামনে এসেছে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর বক্তব্য। রাজুর দাবি, প্রায় তিন মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
রোববার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে রাজু বলেন, গত ৪ অক্টোবর পরিবারের সঙ্গে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর বাসায় যায় তাজমিন। সেখান থেকে সে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং দেখা করার ইচ্ছা জানায়। পরে তাজমিন বাসে করে কক্সবাজারে যায়। সেখানে একটি আবাসিক হোটেলে তারা এক রাত অবস্থান করেন।
তার দাবি, তাজমিনের বাবা-মা বারবার ফোন করায় তিনি তাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। গত বুধবার ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আইকনিক পরিবহনের বাসে তাজমিনকে তুলে দেন তিনি। এরপর কুমিল্লায় পৌঁছানো পর্যন্ত তাজমিন তার সঙ্গে লাইভ লোকেশন শেয়ার করেছিল।
রাজু বলেন, কুমিল্লায় পৌঁছে তাজমিন তাকে জানায়, বাসার প্রধান ফটক বন্ধ থাকায় সে ভেতরে ঢুকতে পারছে না। বাবাকে ফোন করেও সাড়া পাচ্ছে না। তখন রাজু তাকে বাসার সামনে অপেক্ষা করতে এবং অন্য কাউকে দিয়ে বাবাকে ডেকে আনতে বলেন।
রাজুর দাবি, পরে তাজমিন জানায়, এক বন্ধুর বাবাকে পেয়েছে এবং তার সঙ্গে বন্ধুর বাসায় যাবে। সকালে বাড়িতে ফিরবে বলেও জানায় সে।
এরপর ভিডিও কলে রাজু দেখতে পান, তাজমিন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেছে। তিনি তাকে অটোরিকশা থেকে নেমে বাসার সামনে অপেক্ষা করতে বলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাজমিন ফোন কেটে দেয় এবং লাইভ লোকেশন শেয়ার করাও বন্ধ করে দেয়। পরে রাজুকে বার্তা দিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার কথা জানায় তাজমিন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে ফিরে কুমিল্লা নগরের পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় নামে তাজমিন। সেখান থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় তাকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। বাসায় পৌঁছে দেওয়ার বদলে সুমন তাকে লালমাই উপজেলার একটি কৃষিজমিতে নিয়ে যান। সেখানে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় তাজমিনকে।
পুলিশ জানায়, হত্যার পর তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে অন্য একটি অটোরিকশায় পালিয়ে যান সুমন। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে জগৎপুর এলাকার একটি কৃষিজমি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, তদন্তে কোনো বিষয় বাদ দেওয়া হবে না। তাজমিনের সোয়াবের নমুনা, পোশাক, মুঠোফোনসহ বিভিন্ন আলামত সিআইডির ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
একই দিন কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকা থেকে রাজুকে আটক করার তথ্য জানান কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী। রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁকে আটক করা হয়।
এর আগে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া জানিয়েছিলেন, তাজমিন কক্সবাজারে কার সঙ্গে গিয়েছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, রাজুর সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে হয়তো তাজমিনকে কক্সবাজার যেতে হতো না। সে ক্ষেত্রে এমন বিপদের মুখেও পড়তে হতো না।