লাল দালান, শব্দটি কমবেশি সবার পরিচিত। জেলা শহরগুলোতে, বিশেষত পুরনো জেলাগুলোতে—একসময় শহরের বাইরে, নিভৃতে-নীরবে লাল রঙের ইট, সিমেন্ট বা পাথর দিয়ে তৈরি পাকা বাড়ির দিকে মানুষ ভয়ে তাকাত। উঁচু প্রাচীর ঘেরা সেই বাড়ির ভেতরে কী ঘটছে, তা সাধারণের জন্য কৌতূহলের হলেও, ভেতরে প্রবেশের ইচ্ছে সজ্ঞানে কারও হয়নি—এ কথা লেখাই বাহুল্য। মানুষ দূর থেকে দেখেছে, কৌতূহলী হয়েছে, কিন্তু সেখানে যেতে চায়নি। বরং কাউকে ভয় দেখাতে চাইলে, লাল দালানের ভাত খাওয়ার উপমা দিয়েছে। লাল দালান মানেই কারাগার। হালে অপরাধীর জন্য সংশোধনাগার। অথচ একসময় কারাগার নিয়ে অনেক ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে নানান জবানীতে। কারাগারকে দেখা হয়েছে নির্যাতনের অন্যতম স্থান হিসেবে। এই কারাগার এক দিনে তৈরি হয়নি এবং কারাগারের আজকের যে রূপ, তাও এক দিনে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস। তবে উপমহাদেশে লাল দালানের ভেতরে অপরাধীদের শাস্তি যুগের শুরু ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে। ১৭৬৫ সালের ১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার ক্ষমতা গ্রহণ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কোম্পানি তার শাসনক্ষমতা সুসংহত করতে, সাধারণের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে এবং শোষণের হাতিয়ার হিসেবে কারাগারের ব্যবহার শুরু করে। ঔপনিবেশিক আমলেই মানুষকে আতঙ্কিত করতে এবং নিজেদের শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে নতুন নতুন কারাগার নির্মাণ হতে থাকে, সে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে কয়েদির সংখ্যা।
লেখক মো. খোসবর আলী, ১৯৭৬ সালে কারা-বিভাগে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। চাকরি থেকে অবসর নিলেও, কারা জীবনের যে অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেছিলেন, যে অনুসন্ধিৎসু মন তার তৈরি হয়েছিল, সেটিই তাকে উসকে দিয়েছে এমন একটি পরিশ্রমসাধ্য ও প্রয়োজনীয় বই রচনার কাজে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার মননশীল মন এবং গবেষকের দৃষ্টি কারাগারে অনুসন্ধান বইটিকে পূর্ণতা দিয়েছে। বইটি নয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত। শুরুতে ভূমিকা, কৃতজ্ঞতা স্বীকার, শব্দ সংকেত, চিত্র সূচি, সারণি সূচি নামে অংশ রয়েছে। এরপর বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে—সূচনা পর্ব। পর্যায়ক্রমে দণ্ড বা শাস্তি, শাস্তি বিধানকারী প্রতিষ্ঠান, কারা প্রশাসন, কারাগারে দীর্ঘ পথচলা, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বিচারিক নিয়ন্ত্রণ ও কারাগারের ক্ষমতা, উপনিবেশবাদ, আইন ও সহিংসতা, ঔপনিবেশিক অবকাঠামো নির্মাণ ও বন্দিশ্রম, দ্বীপান্তর এবং কয়েদি উপনিবেশ অধ্যায়গুলো সন্নিবেশিত হয়েছে। এ ছাড়া বইয়ের পরিশিষ্ট অংশে রয়েছে—কারা পারিভাষিক শব্দ, গ্রন্থপঞ্জি ও নির্ঘণ্ট। এ ছাড়া বইটিকে আরও তথ্যসমৃদ্ধ ও প্রামাণিক করার জন্য ১০৩টি দুর্লভ ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
লাল দালানের ভয়ে যারা ভীত, তাদের কাছে আন্দামান নিকোবর দীপপুঞ্জের কথাও অবিদিত নয়। রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য ‘কালাপানি’ বা দীপান্তরের মতো অমানবিক দণ্ড কার্যকর করতে আন্দামান ও নিকোবর দীপপুঞ্জের জেলটি নির্মাণে সে সময়েই খরচ হয়েছিল ৫ লাখ ১৭ হাজার ৩৫২ টাকা। মদনমোহন ভৌমিকের আন্দামানে দশ বৎসর বইয়ের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে লেখক জানিয়েছেন, এখানের বন্দিদের খাবার দেওয়া হতো তেল-মসলা ছাড়া শুধু লবণ ও জলে সিদ্ধ করা ডাল, বন-জঙ্গলের ঘাসপাতার তরকারি ও পাথর মিশ্রিত কতকগুলো লাল ভাত। রেঙ্গুনের আতপচাল; সপ্তাহে ছয় দিন অড়হর ডাল ও এক দিন মসুর ডাল। পাক করা খাবারে শকুনের গায়ের মতো গন্ধ। ঢাকা ও প্রেসিডেন্সি জেলেও একই অবস্থা। পানীয় জলের অদ্ভুত ব্যবস্থা; সব বর্ষাকালের বৃষ্টির পানি এক স্থানে জমা করে রাখা হতো। এ পানিই বন্দিদের পান করার জন্য দেওয়া হতো; তবে মাথা প্রতি ১ পাউন্ডের বেশি নয়। এমনকি আন্দামানে মহিলা কয়েদিও পাঠানো হয়েছে। একটি পরিসংখ্যান, আন্দামানে পাঠানো মহিলা কয়েদির প্রথম দলে ১৫৯ জনকে পাঠানো হয়। যাদের মধ্যে তরুণী ও বিধবার সংখ্যাই ছিল বেশি এবং এই ১৫৯ জন মহিলার মধ্যে হিন্দু ছিলেন ১১৭ জন ও মুসলিম ৪২ জন।
মো. খোসবর আলী, তার কারাগারে অনুসন্ধান বইয়ে ঔপনিবেশিক আমলের কারাব্যবস্থা তুলে ধরেছেন। তার গবেষণা ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—১৭৬৫ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কোম্পানি ও ব্রিটিশ শাসনামলের কারা অভ্যন্তরের নানা দিক। পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতা গ্রহণ করে। আর এরপরই তারা কারাব্যবস্থার সূচনা করে। যা ছিল পরাধীন জাতিকে শাসনের অন্যতম হাতিয়ার। সে দিক থেকে মো. খোসবর আলীর কারাগারে অনুসন্ধান বইটিকে অবিভক্ত ভারতের কারাব্যবস্থার ইতিহাস হিসেবে বর্ণনা করা যায়।