গুচ্ছকবিতা

আধেক দেবতা জাগে, আধেক সারমেয়

গথিক-সন্ধ্যা

মনে হয় তুমি দাঁড়িয়ে আছো গথিক স্তম্ভের মতো, আর হাসছো; আমি দেখতে পাচ্ছি তোমার মৃদঙ্গ-ঠোঁট, দূরে কোথাও গান গাইছে ঝিঁঝিদের দল। আমি শুনতে পাচ্ছি তোমার হাসির শব্দ; ঝাউবনে ডেকে উঠছে একটি ডাহুক; আমি স্বপ্নের ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছি ডানা-খসা ফড়িঙের সঙ্গে। স্পষ্ট আমি বুঝতে পারছি তোমার দুহাতের ঘ্রাণ, মর্মরিত সুর, আমি ডুবে যাচ্ছি ঘাসের শয্যায়, আমাকে তোলো...


কফিন
 
আমি বসে থাকি তোমার কফিনের পাশে—
যেন একটা ব্যর্থ ফুল—সাদা ও রক্তরহিত;
চিৎকৃত দুঃখের সরোদ থেমে যায়, শুকিয়ে যায়
আমার পাপড়ি, আর আমি ঘুমিয়ে পড়ি 
তোমার কফিনের খাঁ খাঁ শূন্যতায়...


দেবতা ও সারমেয়
 
স্বর থেকে ব্যঞ্জন
এ শরীর জেনে যায়
প্রতিটি যৌনাক্ষর
কার ও ফলা।
হেমন্তে, নদীর গর্ভে
জমাট কুয়াশায় ভেসে ওঠে
তোমার চন্দ্রকলা 
বাঁক ও বিভঙ্গে
ছলকায় জল
অবিরল, প্রায়ান্ধ পাথর 
গেয়ে যায় 
নিঃস্বতার গান...

নিভৃত বৃষ্টির মতো
থোকা থোকা অন্ধকার,
করতলে জমে ওঠা সবুজ আগুন
উড়ে যায় দূরে যায়
পাহাড়ি আকাশে 

আমি দেখি, হয়তো দেখে সেও—
আধেক দেবতা জাগে, আধেক সারমেয়।


এপিটাফ

সমুদ্রের শেষ ঘুঘু উড়ে যায়,
চুপচাপ আমি তার চলে যাওয়া দেখি,
ডানাভরা মেঘে সন্ধ্যা-হাওয়ায়
ভেসে যায় দূর কোনো গান।
মুঠির ভেতরে থাকে উদাসী সৈকত,
বুনোঝাউ, প্রাচীন পাথর এবং আমি।
জল শুধু প্রবহমান...


মহিষের পিঠে শুয়ে শুয়ে

মহিষের পিঠে শুয়েছিলাম একদিন; দেখেছিলাম—দুটি ছায়াপথের মাঝখান দিয়ে দোল খাচ্ছে জলজ্যান্ত একটা পৃথিবী, হলদে আলোর নিচে উড়ে যাচ্ছে সূর্যাভ রোদ, দূর পাহাড়ের ঘণ্টাধ্বনি, আর কোত্থেকে যেন ঝরে পড়ছিল পাখি ও পতঙ্গের রঙ। মহিষের পিঠে শুয়ে শুয়ে পৃথিবীকে দেখছিলাম একদিন, জঙ্গলের ধারে...


অশ্বারোহী
 
আধখানা চুমু রক্ত-মাংসে
আধখানা চুমু দিগন্তরে,
নীল পৃথিবীর অশ্বারোহী
বর্শা হাতে জোছনা ধরে।
 
তাকিয়ে দেখে দূর সীমানা
জংলি মেঘে আরক ঝরে,
মত্ত ঠোঁটে পান করে সে
পদ্ম ফোটে নীল সায়রে।
 
কী বিদীর্ণ সূর্য ওঠে,
ম্যামথ-স্মৃতি শিরায় শিরায়
অন্ধকারের গুল্মলতায়
ঝঞ্ঝার টানে দৌড়ে বেড়ায়।
 
কোন পাতালের অতলে হ্রদে
শ্যাওলা বেঁধা সবুজ ভ্রমর—
আঁকড়ে ধরে মৃণালবাহু, 
হুল ফুটিয়ে বসায় কামড়
 
আধখানা চুমু রক্ত-মাংসে
আধখানা চুমু দিগন্তরে,
নীল পৃথিবীর অশ্বারোহী
সবুজ ভ্রমর আঁকড়ে ধরে।