টি-টোয়েন্টি রেকর্ডে 'মুড়ি-মিছরির এক দর' বদলানোর প্রস্তাব গাভাস্কারের

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বর্তমান রেকর্ড ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করে আইসিসির কাছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন ভারতীয় ব্যাটিং কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কার। আইসিসির সহযোগী দেশগুলোর রেকর্ডকে পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর রেকর্ডের সমকক্ষে রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। গাভাস্কারের মতে, দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে করা রেকর্ড এবং টেস্ট খেলুড়ে শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে অর্জিত রেকর্ডের মান কখনোই এক হতে পারে না—এ যেন ফুটবলের মতো 'ডিভিশন'ভিত্তিক আলাদা ক্যাটাগরি তৈরি না করে "মুড়ি-মিছরির এক দর" করে দেওয়ার শামিল।
 
ভারতের মিড-ডে পত্রিকায় প্রকাশিত এক কলামে গাভাস্কার যুক্তি দেন যে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রতিযোগিতা ও পারফরম্যান্সের মান বজায় রাখতে অবিলম্বে এই পরিসংখ্যান ক্যাটাগরিতে স্পষ্ট বিভাজন আনা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক সময়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের একাধিক বড় এবং অবিশ্বাস্য রেকর্ড এককভাবে  সহযোগী দেশগুলোর দখলে চলে গেছে, যা এই আলোচনার জন্ম দিয়েছে:
  • দ্রুততম ফিফটি: ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে যুবরাজ সিংয়ের ১২ বলে করা ঐতিহাসিক ফিফটির রেকর্ড ভেঙে দেন নেপালের দীপেন্দ্র সিং ঐরি। মঙ্গোলিয়ার মতো অনভিজ্ঞ দলের বিরুদ্ধে মাত্র ৯ বলে এই ফিফটি হাঁকান তিনি।
  • সর্বোচ্চ দলগত রান ও জয়: গাম্বিয়ার বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের ৩৪৪/৪ রানের বিশাল ইনিংস এবং ২৯০ রানে জয়।
  • সেরা বোলিং ফিগার: মায়ানমারের বিপক্ষে ভুটানের সোনম ইয়েশির ৭ রানে ৮ উইকেট।
  • সর্বনিম্ন রান: আইভরি কোস্টের মাত্র ৭ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জাজনক রেকর্ড।
  • টানা জয়: ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে স্পেনের টানা ২৪টি টি-টোয়েন্টি জয়ের রেকর্ড।
ফুটবল লিগের উদাহরণ টেনে গাভাস্কার জানান, ফুটবলে যেমন আলাদা আলাদা 'ডিভিশন' থাকে এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বা রেকর্ড নির্দিষ্ট ডিভিশন অনুসারেই গণ্য হয়, ক্রিকেটেও সেই পদ্ধতি চালু করা দরকার।

"ফুটবল লিগে বিভিন্ন ডিভিশন থাকে এবং মৌসুম শেষে প্রমোশন ও রেলিগেশন হয়। ফলে সেখানকার যেকোনো রেকর্ড নির্দিষ্ট ডিভিশনের উল্লেখসহ নথিভুক্ত থাকে। ক্রিকেটেও এমন একটি ব্যবস্থা বিবেচনা করা উচিত, যাতে প্রতিপক্ষ ও খেলার মান বুঝে স্পষ্ট বিভাজন থাকে।"

তিনি আরও যোগ করেন, বিশ্বকাপ বা বড় টুর্নামেন্টে যখন পূর্ণ সদস্য ও সহযোগী দেশগুলো মুখোমুখি হবে, তখন সেটিকে মূল ‘আন্তর্জাতিক’ হিসেবে ধরা যেতে পারে। তবে সহযোগী দেশগুলো যখন নিজেদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলবে, তখন সেগুলোকে ‘ডিভিশন এ’ বা ‘ডিভিশন বি’ আন্তর্জাতিক রেকর্ড হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা উচিত।

সহযোগী দেশগুলোর দুর্বল বোলিং ও ফিল্ডিং আক্রমণের মুখে করা বিশাল বোলিং ফিগার ও ব্যাটিং ধ্বংসযজ্ঞকে মূল সারির রেকর্ডের সঙ্গে তুলনা করাকে অনুচিত মন্তব্য করে ভারতের সাবেক এই অধিনায়ক বলেন, "যখন কোনো দল এত কম রানে অলআউট হয়ে যায়, তখন বোলারদের বোলিং গড় বা পরিসংখ্যান কেবল তখনই অসাধারণ দেখায় যখন তারা অনভিজ্ঞ দলের বিপক্ষে খেলে। টেস্ট খেলুড়ে পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর বিপক্ষে করা পরিসংখ্যানের সাথে এটিকে সমপর্যায়ে রাখা কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত বা বিচারসংগত নয়।"

গাভাস্কার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বর্তমান ধারা বজায় থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মূল রেকর্ডগুলোর বড় অংশই এমন সব অনামী খেলোয়াড়দের দখলে চলে যাবে, যাদের নাম সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা হয়তো আর কখনোই শুনবেন না।

আলোচনায় দীপেন্দ্র সিং ঐরির ১২ বলের রেকর্ড ভাঙার প্রসঙ্গে গাভাস্কার পরিষ্কার করেন যে, তিনি নেপালের সাফল্যকে খাটো করছেন না। বিশ্ব ক্রিকেটে নেপালের দ্রুত অগ্রগতির প্রশংসা করে তিনি বলেন, 'ভুল বুঝবেন না, নেপাল দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে—যা আমরা চলতি বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও দেখেছি, যেখানে তারা ইংল্যান্ডকে প্রায় হারিয়ে দিচ্ছিল। তাই তাদের ব্যাটার ও বোলাররা যখন অন্যান্য সহযোগী দেশকে গুঁড়িয়ে দেয়, তা অবাক করার মতো নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মঙ্গোলিয়া বা মায়ানমারের মতো দলের বিপক্ষে করা পারফরম্যান্স কি বিশ্ব রেকর্ডের তালিকায় এক পাল্লায় মাপা উচিত?"

পরিশেষে গাওস্কর আইসিসির দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানান, আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের খাতিরে প্রতিযোগিতার মান পর্যবেক্ষণ করে আলাদা ক্যাটাগরি তৈরি করাই এখন সময়ের দাবি।